TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

মার্কিন সিনেটে আব্দুল এল-সায়েদের বিজয়ঃ উচ্ছ্বাসের কেন্দ্রে ভারতের কর্ণাটকের ভটকল

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন আব্দুল এল-সায়েদ। তার এই বিজয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, সুদূর ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের উপকূলীয় ছোট শহর ভটকলেও ছড়িয়ে পড়েছে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস। এর কারণ, এল-সায়েদের স্ত্রী সারা জুকাকুর পারিবারিক শিকড় এই শহরে। প্রায় ৭৫ বছর ধরে ভটকলের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে তার পরিবার।

সারা জুকাকু দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন মুসলিম বণিক সম্প্রদায় নাওয়ায়াথের সদস্য। প্রায় ৬০০ বছর আগে ইয়েমেন, আরব, ইরান ও ইরাক থেকে আসা মুসলিম বণিকরা দক্ষিণ ভারতের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। সময়ের সঙ্গে এই সম্প্রদায় ওই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সারার নানা জুকাফু শামসুদ্দিন ছিলেন ভটকলের একজন প্রখ্যাত আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। ১৯৫০-এর দশকে মহীশূর সরকারের উপ-অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বি. ডি. জাত্তির মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পাওয়া শামসুদ্দিন ছিলেন নাওয়ায়াথ সম্প্রদায়ের প্রথম আইনজীবী এবং মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত প্রথম ব্যক্তি।

১৯১৪ সালে কর্ণাটকের উত্তর কন্নড় জেলার ভটকলে জন্মগ্রহণ করেন শামসুদ্দিন। কুমতায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ১৯৩৩ সালে ধারওয়াড়ের কর্ণাটক কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৩৫ সালে বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কোলাপুরের সাইকস কলেজ অব ল থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। এরপর নিজ শহর ভটকলে আইন পেশা শুরু করেন।

আইন পেশার পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। মুসলিম লীগে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৩৬ সালে দলটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ‘মুসলিম পলিটিক্যাল কনফারেন্স’ আয়োজন করেন। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত নর্থ ক্যানারা ডিএলবির সদস্য ছিলেন। একই সময়ে নর্থ ক্যানারা জেলা মুসলিম কনফারেন্সের সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৬ সালে বোম্বে বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন শামসুদ্দিন। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে ভিলেজ ইন্ডাস্ট্রিজ এনকোয়ারি কমিটি, পোর্ট ডেভেলপমেন্ট কমিটি, বোম্বে প্রভিন্সিয়াল প্রোহিবিশন কমিটি এবং প্রভিন্সিয়াল রুরাল ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব দায়িত্বের মাধ্যমে স্থানীয় উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

নিজ শহর ভটকলের উন্নয়নেও তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি আনজুমানে হামি-ই-মুসলিমিনের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি জেলা স্কুল বোর্ড ও ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সদস্য ছিলেন। তার সহযোগিতায় শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি কটেজ হাসপাতাল, যা বর্তমানে সরকারি জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত।

১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ভটকল পৌরসভার সভাপতি ছিলেন শামসুদ্দিন। তার নেতৃত্বাধীন সময়ে শহরে প্রথমবারের মতো ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু হয়। একই সময় বিদ্যুৎ, সড়কবাতি ও টেলিফোন সংযোগ সম্প্রসারিত হয়। স্থানীয় অবকাঠামোর এই পরিবর্তন ভটকলের নগর উন্নয়নে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

১৯৫৬ সালের রাজ্য পুনর্গঠন আইনের মাধ্যমে ভটকল নবগঠিত মহীশূর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়, যা বর্তমানে কর্ণাটক নামে পরিচিত। পরের বছর ১৯৫৭ সালে হোন্নাভার কেন্দ্র থেকে মহীশূর বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন শামসুদ্দিন। ১৯৫৮ সালের ২৪ মে বি. ডি. জাত্তির মন্ত্রিসভায় উপ-অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার পর একই বছরের ২ জুলাই উপ-বিদ্যুৎমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৬৪ সালের ২৬ মার্চ তার মৃত্যু হয়।

শামসুদ্দিনের ছয় মেয়ে ও চার ছেলে ছিল। মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি ব্যাঙ্গালোরের জয়মহল এলাকায় বসবাস করতেন। মৃত্যুর কয়েক দশক পরও ভটকলে তার অবদান স্মরণ করা হয়। শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল তার নামে ‘শামসুদ্দিন জংশন’ হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া ব্যাঙ্গালোরে ভটকল মুসলিম জামায়াতের একটি ভবনের নামও রাখা হয়েছে তার নামে।

শামসুদ্দিনের ছেলে ড. তৈয়ব জুকাকু হলেন সারা জুকাকুর বাবা এবং আব্দুল এল-সায়েদের শ্বশুর। তিনি একজন কিডনি বিশেষজ্ঞ। ব্যাঙ্গালোরে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি মুসলিম সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তিনি ইসলামিক সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

অন্যদিকে, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় আব্দুল এল-সায়েদের সঙ্গে সারা জুকাকুর পরিচয় হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকাণ্ডে দুজনই সক্রিয় ছিলেন। পরিচয় থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্কের পরিণতি ঘটে বিয়েতে। ২০০৬ সালের মে মাসে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে তাদের এমালি ও সেরিন নামে দুই কন্যাসন্তান রয়েছে।

দক্ষিণ ভারতীয় শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময় উষ্ণ অনুভূতি প্রকাশ করেছেন এল-সায়েদ। এক সাক্ষাৎকারে হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে তিনি বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি একটি দক্ষিণ ভারতীয় পরিবারের সদস্য। এখন নিজেকে ওই পরিবারেরই একজন মনে করেন। এমনকি রসিকতা করে বলেছেন, আরবের চেয়ে নিজেকে এখন বেশি ভারতীয় মনে হয়।

এল-সায়েদের ঐতিহাসিক নির্বাচনী বিজয় তাই ভটকলের মানুষের কাছে কেবল একজন মার্কিন রাজনীতিকের সাফল্য নয়; বরং শহরটির দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ অর্জন। কয়েক দশক আগে যে পরিবারের একজন সদস্য স্থানীয় উন্নয়ন ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই পরিবারের উত্তরসূরির স্বামী যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইতিহাস গড়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভটকলের নাম।

সূত্রঃ টাইমস অব ইন্ডিয়া

এমকে

আরো পড়ুন

কোকাকোলার জরুরি নির্দেশনা, নিজেদের জনপ্রিয় এক পানীয় পান না করার আহ্বান

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাঃ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা ব্রিটেনের

নিউজ ডেস্ক

ইরানের পর এবার আমরা পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের চিন্তা করছিঃ ইসরায়েল