যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনের নিয়োগকে ঘিরে লেবার সরকারের ভেতরে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক জেনেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদে বসানোর ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন দলের একাধিক এমপি। অনেকেই বলছেন, স্টারমারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সময় “দিন গোনার” পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সংসদে এই ইস্যুতে সরকার প্রায় পরাজয়ের মুখে পড়ে যায়। শেষ মুহূর্তে মেগ হিলিয়ার ও অ্যাঞ্জেলা রেইনারের আনা সংশোধনীর মাধ্যমে ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ সংক্রান্ত নথি এবং এপস্টাইনের সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশে সরকারকে বাধ্য করা হয়। ওই সংশোধনী না এলে সরকার বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা খেত বলে স্বীকার করেছেন একাধিক লেবার এমপি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এসব নথি প্রকাশ পেলেই স্টারমারের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এক এমপি বলেন, “সব সত্য সামনে আসুক—তারপর দেখা যাবে কী হয়।” আরেক সাবেক মন্ত্রী মন্তব্য করেন, “সাম্প্রতিক সময়ে অনেক খারাপ দিন গেছে, কিন্তু এটি সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ।”
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বীকার করেন, ম্যান্ডেলসনের এপস্টাইনের সঙ্গে বন্ধুত্বের বিষয়টি তিনি নিয়োগের আগেই জানতেন। এই স্বীকারোক্তির পর সংসদের পরিবেশ নাটকীয়ভাবে বদলে যায় বলে জানান উপস্থিত এমপিরা। একজন বলেন, “মুহূর্তেই সব অন্ধকার হয়ে গেল।” যদিও ডাউনিং স্ট্রিট পরে দাবি করে, প্রধানমন্ত্রী কেবল প্রকাশ্য তথ্য সম্পর্কেই অবগত ছিলেন।
লেবার ব্যাকবেঞ্চারদের অনেকেই এ সিদ্ধান্তকে ‘অমার্জনীয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এক এমপি বলেন, “এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কের কথা জেনেও তাকে চাকরি দেওয়া হয়েছে—এটা স্টেরয়েডে ফুলে ওঠা ক্রিস পিঞ্চার কেলেঙ্কারির মতো।” তার ভাষায়, “এই স্বীকারোক্তির পর আর ফেরার পথ নেই।”
সরকারের ভেতরে চাপ বাড়ছে প্রধানমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ মর্গান ম্যাকসুইনির ওপরও। একাধিক এমপি মনে করছেন, ম্যান্ডেলসনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার দায় নিয়ে তার পদত্যাগ করা উচিত। তাদের আশঙ্কা, সামনে আরও তথ্য প্রকাশ পেলে সরকার থেকে একাধিক বিদায় ঘটতে পারে।
এদিকে মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে চলমান একটি ফৌজদারি তদন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় কিছু নথি আপাতত প্রকাশে বাধা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি গোপন সরকারি নথি এপস্টাইনের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন। পুলিশ বলেছে, তদন্তের স্বার্থেই নথি প্রকাশে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
এর আগে ডাউনিং স্ট্রিট জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অজুহাতে নথি প্রকাশ সীমিত করার চেষ্টা করলে সংসদে তা ‘ঢাকনা দেওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে সমালোচিত হয়। এমপিরা জোর দেন, কোন নথি প্রকাশ হবে তা ক্যাবিনেট সেক্রেটারির নয়, সংসদের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কমিটির সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।
এই সংকটে অ্যাঞ্জেলা রেইনারের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। সরকারকে সংসদীয় পরাজয় থেকে বাঁচাতে শেষ মুহূর্তে তিনি সক্রিয় হন। দলের ভেতরে অনেকেই প্রকাশ্যে না বললেও মনে করছেন, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে রেইনারই এখন সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে।
নথি প্রকাশের প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত সংসদে পাস হয়েছে। ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, পুলিশি পরামর্শ মেনে যত দ্রুত সম্ভব তারা নথি প্রকাশ করবে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, পিয়ারদের উপাধি প্রত্যাহার সহজ করতে নতুন আইন আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং ম্যান্ডেলসনকে প্রিভি কাউন্সিল থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ ইতোমধ্যে রাজা চার্লসের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এই রাজনৈতিক ঝড়ের মাঝেই স্টারমার বৃহস্পতিবার তার অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন এজেন্ডা সামনে আনার চেষ্টা করবেন। ‘প্রাইড ইন প্লেস’ প্রকল্পের আওতায় আগামী ১০ বছরে ৩০০-এর বেশি বঞ্চিত এলাকায় ৫ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনৈতিক বাস্তবতায়, এই ঘোষণাও আদৌ ম্যান্ডেলসন–এপস্টাইন কেলেঙ্কারির ছায়া কাটাতে পারবে কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

