যুক্তরাজ্যের অন্যতম বড় শহর লিভারপুলের একটি নির্বাচনী এলাকা এখন দেশের ‘ভাতা রাজধানী’ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। কর্মক্ষম বয়সী মানুষের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের বাইরে, বহু পরিবার সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এবং স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে লিভারপুল ওয়ালটনে অর্থনৈতিক সংকটের একটি গভীর চিত্র ফুটে উঠেছে।
লিভারপুল ওয়ালটন নির্বাচনী এলাকার মধ্যে রয়েছে নরিস গ্রিন, ক্রোক্সটেথ, ক্লাবমুর ও ফাজাকারলি। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের মধ্যে এই এলাকাতেই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভাতা বা পিআইপি গ্রহণকারীর হার সবচেয়ে বেশি। প্রায় ১৫ হাজার কর্মক্ষম বয়সী বাসিন্দা পিআইপি পান, যা এলাকার কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৩ শতাংশ।
শুধু পিআইপি নয়, ইউনিভার্সাল ক্রেডিটের ওপরও ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। এলাকার প্রায় ৩৯ শতাংশ পরিবার এই সরকারি সহায়তা গ্রহণ করে। অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬ শতাংশ বেকারত্ব-সম্পর্কিত সরকারি ভাতা পান।
লিভারপুল ওয়ালটনের নরিস গ্রিন এলাকায় গিয়ে প্রতিবেদকের চোখে পড়ে বন্ধ ও তক্তা দিয়ে আটকানো দোকান এবং শাটার নামানো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রেতা কমে যাওয়া এবং স্থানীয় অর্থনীতির দুর্বলতার প্রভাব শহরের এই অংশে স্পষ্ট।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকায় চাকরির সুযোগ সীমিত। যেসব কাজ পাওয়া যায়, তার অনেকগুলোর বেতনও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে কর্মক্ষম মানুষের একটি অংশ কাজের সন্ধানে ব্যর্থ হয়ে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
৪৭ বছর বয়সী স্থানীয় ব্যবসায়ী লিন্ডসে টেলর তার চার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার আশঙ্কা, বাড়ির দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে তার মেয়েদের নিজেদের বাড়ি কেনা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি জানান, তার মেয়েরা পরিশ্রমী হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই পরিশ্রমের যথাযথ প্রতিফলন মিলছে না। তার মতে, তারা হয়তো ভবিষ্যতেও তার সঙ্গেই বসবাস করতে বাধ্য হবে।
টেলরের বক্তব্যে শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়, বরং কম মজুরি ও দ্রুত বাড়তে থাকা আবাসন ব্যয়ের কারণে তরুণ প্রজন্মের সামনে তৈরি হওয়া বৃহত্তর সমস্যাটিও উঠে এসেছে।
জ্বালানি দক্ষতা অবকাঠামো গোষ্ঠীর তথ্য অনুযায়ী, লিভারপুল ওয়ালটন এলাকায় একটি পরিবারের গড় বার্ষিক আয় প্রায় ৩৩ হাজার পাউন্ড। একই সময়ে জাতীয় গড় আয় প্রায় ৩৭ হাজার ৫০০ পাউন্ড।
অর্থাৎ জাতীয় গড়ের তুলনায় এলাকার পরিবারের আয় প্রায় ৪ হাজার ৫০০ পাউন্ড কম। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, কম আয়, আবাসন ব্যয় এবং সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ একসঙ্গে তাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে।
৮৪ বছর বয়সী গওয়েন টালি সারাজীবন লিভারপুল ওয়ালটনে বসবাস করেছেন। তার ভাষ্য, তিনি এমন বহু মানুষকে চেনেন যারা কাজ করতে চান, কিন্তু চাকরি পাচ্ছেন না।
তার মতে, এলাকায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকাই অন্যতম বড় সমস্যা।
এই বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারি ভাতা গ্রহণকারী সবাই যে কাজ করতে অনিচ্ছুক—এমন ধারণাকে স্থানীয় অভিজ্ঞতা পুরোপুরি সমর্থন করে না। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা বাসিন্দাদের মধ্যে কেউ কেউ কাজের প্রতি অনাগ্রহী হলেও অনেকেই বাস্তবে কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকার কারণে বেকার রয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের গবেষণা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বঞ্চিত ১৫টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে লিভারপুল ওয়ালটন রয়েছে।
এই বঞ্চনা পরিমাপের ক্ষেত্রে শুধু আয় নয়; কর্মসংস্থান, শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যগত বঞ্চনা, অপরাধ, আবাসন ও বিভিন্ন সেবায় প্রবেশের সুযোগ এবং বসবাসের পরিবেশের মতো একাধিক বিষয় বিবেচনা করা হয়।
ফলে লিভারপুল ওয়ালটনের সংকটকে কেবল ‘বেশি ভাতা গ্রহণের এলাকা’ হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। এর পেছনে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, কম আয়, আবাসন ব্যয় এবং স্থানীয় ব্যবসার দুর্বলতার মতো একাধিক কারণ রয়েছে।
এলাকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। কর্মক্ষম মানুষের অর্থনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা বাড়লে স্থানীয় শ্রমবাজার দুর্বল হয়। একই সময়ে ব্যবসা কমে গেলে বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে নতুন চাকরির সুযোগও সংকুচিত হয়।
ফলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার কারণে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়ে, আবার ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এভাবে সরকারি সহায়তা গ্রহণ, বেকারত্ব, কম আয় এবং ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সমস্যার সমাধানের জন্য রাতারাতি বড় কোনো কারখানা কিংবা গাড়ি নির্মাণকেন্দ্র স্থাপন করতেই হবে—এমন দাবি তারা করছেন না।
তাদের মূল চাওয়া হলো, স্থানীয় মানুষকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া এবং ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোকে টিকে থাকার জন্য আরও সহায়তা করা।
স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে একদিকে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহও বাড়তে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় সেবা ও ব্যবসাগুলোও উপকৃত হতে পারে।
লিভারপুল ওয়ালটনকে ‘যুক্তরাজ্যের ভাতা রাজধানী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও স্থানীয় মানুষের বক্তব্যে আরেকটি বাস্তবতা সামনে এসেছে। সরকারি সহায়তা নেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তি কাজ করতে চান না—এমন ধারণা যেমন পুরোপুরি সঠিক নয়, তেমনি কর্মসংস্থানের অভাবও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এলাকায় এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা কাজ করতে আগ্রহী এবং পরিশ্রমী, কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই।
তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সমস্যার সমাধান শুধু ভাতা কমানো বা সরকারি সহায়তা সীমিত করার মধ্যে নয়; বরং মানুষের জন্য টেকসই ও ভালো বেতনের কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং স্থানীয় ব্যবসাগুলোকে শক্তিশালী করার মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ রয়েছে।
লিভারপুল ওয়ালটনের বর্তমান পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের বৃহত্তর একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—মানুষকে শুধু সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল রাখার বদলে কীভাবে তাদের জন্য এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা যায়, যেখানে তারা স্থায়ী চাকরি, ভালো আয় এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ পাবেন।
সূত্রঃ দ্য এক্সপ্রেস
এম.কে

