TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে অভিবাসীদের ধরতে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা

যুক্তরাজ্যে অভিবাসনবিরোধী ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটির সরকার। এ লক্ষ্যে পরিবহনকেন্দ্র ও জনসমাগমস্থলে সরাসরি ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নতুন নীতিমালা ও সরকারি নথিতে দেখা গেছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বাইরেও সাধারণ অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চায় সরকার।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি বা লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা ব্যবহার করে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করার কর্মসূচি তৈরি করছে।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে পুনরায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, যাদের বহিষ্কারের ব্যবস্থা চলছে তাদের খুঁজে বের করা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধ দমনের পরিকল্পনা রয়েছে। এমনকি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অনুমতি ছাড়া অবস্থান করা কিংবা প্রবেশের অনুমতি ছাড়াই যুক্তরাজ্যে প্রবেশের মতো বিষয়েও নজরদারি চালানো হতে পারে।

সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, এসব ক্যামেরার সাহায্যে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের অবস্থান শনাক্ত করে তাদের অভিবাসনসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। এতে বাড়ি বা কর্মস্থলে বারবার অভিযান চালানোর তুলনায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে বলে দাবি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

গত ৮ অক্টোবর অভিবাসন কর্মকর্তাদের জন্য প্রকাশিত নতুন নির্দেশিকা এবং পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত তথ্য সুরক্ষা মূল্যায়ন নথিতে এসব পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ অভিবাসন আইন প্রয়োগের বাজেট দ্বিগুণ করার এবং কর্মীসংখ্যা ৬০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এর মাধ্যমে আরও কয়েক হাজার অভিযান, গ্রেপ্তার ও বহিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উত্তর ওয়েলসের হলিহেড বন্দরে অভিবাসন কর্মকর্তারা তিন দফায় মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার করেন। ওই পরীক্ষাগুলো মূলত আয়ারল্যান্ড থেকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশকারী এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য পরিচালিত হয়েছিল, যাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের আদেশ অথবা অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল।

নতুন পরিকল্পনায় প্রযুক্তিটির ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছে। অভিবাসন আইনে আটকযোগ্য ব্যক্তি এবং প্রবেশ বা অবস্থানের শর্ত ভঙ্গকারীদেরও নজরদারির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি এখন আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

পরিবহনকেন্দ্রের পাশাপাশি জনসমাগম বেশি হবে এমন নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানেও মুখ শনাক্তকরণ ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের তালিকায় এমন এলাকাও রাখা হয়েছে, যেখানে সম্প্রদায়গত সংবেদনশীলতা বেশি। তবে কোন অনুষ্ঠান বা স্থানকে লক্ষ্য করা হবে, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, অভিবাসন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির আরও পরীক্ষামূলক ব্যবহার বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য সুবিধা, প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে সক্রিয়ভাবে পর্যালোচনা চলছে।

নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সীদের নজরদারির তালিকায় রাখা হবে না। তবে এর আগে চলতি বছর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিশু অভিবাসীদের বয়স নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি মুখ বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ভুলভাবে শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে শনাক্ত করার বিষয়টি জানা সত্ত্বেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটি ব্যবহার অব্যাহত রেখেছিল।

এদিকে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহার নিয়ে মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, জনসমাগমস্থলে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার ব্যাপক নজরদারির ঝুঁকি তৈরি করবে এবং বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ভুলভাবে শনাক্ত করার প্রবণতা রয়েছে।

যৌথ কাউন্সিল ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব ইমিগ্র্যান্টসের মুখপাত্র গ্রিফ ফেরিস বলেছেন, অভিবাসন কর্মকর্তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডই অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। জনসমাগমস্থলে বর্ণবাদী নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার সেই আতঙ্ক আরও বাড়াবে।

ওপেন রাইটস গ্রুপের সারাহ লাসোয়ে বলেন, জনসম্মতি, স্বচ্ছতা ও যথাযথ পর্যালোচনা ছাড়াই বিতর্কিত মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করছে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। সরকারি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে জাতীয় আইন না থাকায় পুলিশ ও অভিবাসন কর্মকর্তারা এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সরকারি নথিতে দাবি করা হয়েছে, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার বায়োমেট্রিক ও নজরদারি ক্যামেরা কমিশনার এবং তথ্য কমিশনারের কার্যালয়সহ বাইরের সংস্থাগুলোর তদারকির আওতায় রয়েছে। তবে বায়োমেট্রিক ও নজরদারি ক্যামেরা কমিশনার উইলিয়াম ওয়েবস্টার জানিয়েছেন, এই নীতিমালা প্রণয়নের সময় তার সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি এবং অভিবাসনসংক্রান্ত কাজে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার তার দায়িত্বের আওতায় পড়ে না।

তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির বিস্তার বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার আওতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে। ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য যে আইনগত কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে এসব বিষয় সমাধান হবে বলে তিনি আশা করছেন।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল পার্কে প্রাণঘাতী বিরল রোগের আশঙ্কাঃ হ্রদের পানি এড়িয়ে চলার সতর্কতা

কাজের সক্ষমতা থাকলে সহায়তা বন্ধ—আশ্রয়নীতি কঠোর করছে ব্রিটিশ সরকার

নিউজ ডেস্ক

হোটেল নির্ভরতা কমাতে সামরিক ঘাঁটিতে আশ্রয়প্রার্থী স্থানান্তর শুরু যুক্তরাজ্যে