15.2 C
London
August 21, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে করের হিসাবে ‘বেপরোয়া’ ভুলেও ফৌজদারি মামলার প্রস্তাব

যুক্তরাজ্যে করদাতাদের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কর কর্তৃপক্ষ এইচএমআরসি সরাসরি করের ক্ষেত্রে এমন একটি নতুন ফৌজদারি অপরাধ চালুর প্রস্তাব করেছে, যার আওতায় কোনো ব্যক্তি জেনেশুনে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও করসংক্রান্ত অসত্য তথ্য বা ঘোষণা জমা দিলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে কর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নিয়মটি যথেষ্ট স্পষ্ট না হলে অসততা না থাকলেও কিছু করদাতা ফৌজদারি তদন্তের মুখে পড়তে পারেন।

প্রস্তাবটি মূলত আয়করসহ সরাসরি করের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। বর্তমানে সরাসরি করের বিষয়ে কোনো ব্যক্তিকে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করতে সাধারণত অসততার বিষয়টি প্রমাণ করা প্রয়োজন। নতুন প্রস্তাবে সেই কাঠামোর পাশাপাশি ‘বেপরোয়া অবস্থায় অসত্য বক্তব্য বা ঘোষণা’ দেওয়ার জন্য আলাদা অপরাধ যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

এইচএমআরসির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত আইন সাধারণ মানুষের ছোটখাটো বা প্রকৃত ভুলকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার জন্য তৈরি করা হয়নি। বরং কোনো করদাতা তথ্যটি ভুল হওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং সেই ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও তথ্যটি কর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন—এমন পরিস্থিতিই মূলত নতুন অপরাধের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তবে কর বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের জায়গা এখানেই। তাদের মতে, ‘অসাবধানতা’, ‘বেপরোয়া আচরণ’ এবং ‘ইচ্ছাকৃত অসততা’—এই তিনটির মধ্যে সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা না গেলে সাধারণ করদাতারাও সমস্যায় পড়তে পারেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বড় অঙ্কের করছাড় বা কর-সুবিধা দাবি করলেন, কিন্তু তিনি সেই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য কি না, তা যথাযথভাবে যাচাই করলেন না। এমন পরিস্থিতিতে যদি কর্তৃপক্ষ মনে করে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভুল হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, তাহলে বিষয়টি নতুন অপরাধের আওতায় বিবেচিত হতে পারে।

স্বনিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ নিজেই নিজের কর বিবরণী তৈরি করেন এবং তার অন্য কোনো ব্যাংক হিসাবে অতিরিক্ত আয় জমা হয়েছে কি না, তা যাচাই না করেই কর বিবরণী জমা দেন—এমন পরিস্থিতিও প্রস্তাবিত আইনের আলোচনায় উঠে এসেছে।

তবে এইচএমআরসি স্পষ্ট করেছে, সত্যিকার অর্থে অনিচ্ছাকৃত ও ছোটখাটো ভুলের ক্ষেত্রে নতুন অপরাধ প্রয়োগ করার কথা নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, প্রকৃত ভুল-বোঝাবুঝির কারণে কোনো ব্যক্তি তার কর বিবরণীতে অল্প পরিমাণ ব্যাংক সুদের আয় উল্লেখ করতে ভুলে গেলে সেটিকে নিছক অসাবধানতাজনিত ভুল হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

প্রস্তাবিত পরিবর্তনের পেছনে এইচএমআরসির অন্যতম লক্ষ্য হলো কর ফাঁকি ও কর-অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা। সরকারের যুক্তি, এমন কিছু ক্ষেত্রে বর্তমানে অসততা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণ স্পষ্টভাবে বেপরোয়া ছিল। নতুন অপরাধ চালু হলে সেই ধরনের ঘটনায় প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষের হাতে একটি বিকল্প আইনি ব্যবস্থা থাকবে।

এই প্রস্তাব অবশ্য এখনো চূড়ান্ত আইন নয়। এটি সরকারের পরামর্শ প্রক্রিয়ার অংশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কর বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবের ওপর পাওয়া মতামত পর্যালোচনা করার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

প্রস্তাবিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে গুরুতর শাস্তির বিধান থাকতে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অপরাধ প্রমাণিত হলে সীমাহীন অর্থদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে করদাতাদের জন্য কর বিবরণী যথাযথভাবে প্রস্তুত ও যাচাই করার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব ট্যাক্সেশন সতর্ক করে বলেছে, নতুন অপরাধের ক্ষেত্রে সতর্কতা, বেপরোয়া আচরণ এবং ইচ্ছাকৃত অসততার মধ্যে যথেষ্ট পরিষ্কার পার্থক্য থাকা প্রয়োজন। তাদের আশঙ্কা, এই সীমারেখা অস্পষ্ট হলে নিয়ম মেনে চলা করদাতা এবং কর-পরামর্শকারীরাও ফৌজদারি তদন্তের হুমকির মধ্যে পড়তে পারেন।

কর প্রতিষ্ঠান মুর কিংস্টন স্মিথের জন হুডও বিষয়টিকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, একজন সাধারণভাবে নিয়ম মেনে চলা ব্যক্তি যে সতর্কতা অবলম্বন করতেন, তা না করা এবং কোনো তথ্য ভুল হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়েও ইচ্ছাকৃতভাবে তা যাচাই না করার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা সহজ হবে না।

এইচএমআরসি অবশ্য সমালোচনার জবাবে বলেছে, প্রকৃত ভুলের কারণে মানুষ ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হবেন—এমন ধারণা সঠিক নয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রস্তাবটি মূলত এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করছে যারা করসংক্রান্ত তথ্য অসত্য হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা সত্ত্বেও তা জমা দেন।

এই পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার সরাসরি ও পরোক্ষ কর ব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান আইনি পার্থক্যও কমাতে চায়। বর্তমানে মূল্য সংযোজন করের মতো পরোক্ষ করের ক্ষেত্রে বেপরোয়া অবস্থায় অসত্য বক্তব্য বা ঘোষণা দেওয়ার জন্য বিদ্যমান আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন প্রস্তাবটি আয়করের মতো সরাসরি করের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর কথা বলছে।

সব মিলিয়ে, নতুন প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য প্রকৃত ভুল করা করদাতাকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং ভুল তথ্য দেওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা সত্ত্বেও তা জমা দেওয়ার মতো গুরুতর আচরণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা। তবে প্রস্তাবটি কীভাবে চূড়ান্ত আইনে রূপ নেয় এবং ‘বেপরোয়া আচরণ’ ও ‘সৎ ভুল’-এর মধ্যে সীমারেখা কতটা স্পষ্ট করা হয়, সেটিই এখন করদাতা ও বিশেষজ্ঞদের প্রধান নজরের বিষয়।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

কিয়ার স্টারমারের সাহায্য বাজেট কমানোর সিদ্ধান্তে আরো এক মন্ত্রীর পদত্যাগ

ব্রেক্সিটের এক দশকঃ নতুন জরিপে ৫৮% ব্রিটিশের ইইউতে ফেরার পক্ষে রায়

জঙ্গিগোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিলেন, স্বীকার করলেন শামীমা বেগম