TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে পানির বিলে নতুন ধাক্কাঃ কঠোর বার্তা প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের লাখো পরিবারের জন্য আবারও বাড়ছে পানি বিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফওয়াট (Ofwat) পানি কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত ৩.৪ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, গ্রাহকদের কোনোভাবেই কোম্পানিগুলোর ব্যর্থতার মূল্য পরিশোধের “ফাঁকা চেক” হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

অফওয়াটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাউদার্ন ওয়াটার, থেমস ওয়াটার, সেভার্ন ট্রেন্ট, ওয়েসেক্স ওয়াটার ও সাউথ ইস্ট ওয়াটার—এই পাঁচটি কোম্পানি দশকের শেষ হওয়ার আগেই পরিকল্পনার চেয়ে বেশি বিল আদায় করতে পারবে। অন্য কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ ২০৩০-এর দশকে গ্রাহকদের বিলের সঙ্গে যোগ করবে।

কোম্পানিগুলো অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে অতিরিক্ত ৪.৩ বিলিয়ন পাউন্ড চেয়েছিল। এর মধ্যে ৩.৪ বিলিয়ন পাউন্ড অনুমোদন দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এই অর্থ নতুন আবাসন প্রকল্প, ডেটা সেন্টার, পানি সরবরাহের নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম বলেন, বছরের পর বছর মানুষকে বেশি বিল দিতে হয়েছে, অথচ দূষণের ঘটনা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং পাইপলাইন এখনো লিক করছে। তার ভাষায়, “এটি গ্রাহকদের দোষ নয়। অন্যদের ব্যর্থতার খরচ জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া চলবে না।” তিনি আরও বলেন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় যদি পরিবারগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়, তাহলে সরকার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

এই অতিরিক্ত ব্যয় আগেই অনুমোদিত ১০৪ বিলিয়ন পাউন্ডের বিনিয়োগ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। সেই পরিকল্পনার কারণে ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের গৃহস্থালি পানি বিল গড়ে ৩৬ শতাংশ বাড়ার কথা ছিল। নতুন অনুমোদনের ফলে কিছু গ্রাহককে আরও বেশি অর্থ গুনতে হবে।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সাউদার্ন ওয়াটার-এর গ্রাহকদের বিলে অতিরিক্ত ৮০ পাউন্ড যোগ হবে। থেমস ওয়াটার ও সেভার্ন ট্রেন্ট-এর গ্রাহকদের অতিরিক্ত ৮ পাউন্ড, ওয়েসেক্স ওয়াটার-এর গ্রাহকদের ১১ পাউন্ড এবং সাউথ ইস্ট ওয়াটার-এর গ্রাহকদের ১ পাউন্ড বেশি পরিশোধ করতে হবে।

আগের অনুমোদিত বৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে সাউদার্ন ওয়াটারের গ্রাহকদের ওপর। ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের বার্ষিক বিল ৫৩ শতাংশ বেড়ে ৬৪২ পাউন্ডে পৌঁছাবে। একই সময়ে সেভার্ন ট্রেন্টের বিল ৪৭ শতাংশ, ওয়েলসের ডুর সিম্রি ও হ্যাফরেন ডিফরডুই-এর বিল ৪২ শতাংশ এবং থেমস ওয়াটারের বিল ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে।

পানি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থানও আরও কঠোর হয়েছে। বার্নহাম জানিয়েছেন, বিপুল ঋণে জর্জরিত থেমস ওয়াটারকে সরকারি মালিকানায় নেওয়ার সম্ভাবনাও সরকার পর্যালোচনা করছে। একই সঙ্গে পানি খাতে জননিয়ন্ত্রণ কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়েও কাজ চলছে।

অফওয়াটের সিদ্ধান্তের পর পানি শিল্প জাতীয়করণের দাবিও জোরালো হয়েছে। লেবার এমপি ক্লাইভ লুইস অভিযোগ করেছেন, গ্রাহকদের বিলের বড় অংশ বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতাদের মুনাফায় চলে যাচ্ছে। তার মতে, অবকাঠামো, ঋণ ও মুনাফার খরচ জনগণই বহন করছে, অথচ কোম্পানিগুলো আবারও বাড়তি অর্থ দাবি করছে।

লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের পরিবেশবিষয়ক মুখপাত্র টিম ফ্যারন বলেছেন, অফওয়াট কার্যত ব্যর্থতার “রাবার স্ট্যাম্পে” পরিণত হয়েছে। তার দাবি, কয়েক দশকের অবহেলায় ভেঙে পড়া পানি নেটওয়ার্ক মেরামতের খরচ এখন পরিশ্রমী পরিবারগুলোর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

জিএমবি ইউনিয়নের কর্মী ও সাবেক পানি কর্মী ক্লিফ রোনি বলেন, থেমস ওয়াটার কোটি কোটি লিটার পানি অপচয় করছে এবং নদীতে পয়ঃবর্জ্য ফেলছে, অথচ তাদের শীর্ষ কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের বোনাস ও বিদায়ী সুবিধা পাচ্ছেন। তার মতে, এই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হলো পানি খাতকে আবার সরকারি মালিকানায় ফিরিয়ে আনা।

পরিবেশবাদী সংগঠন রিভার অ্যাকশন বলছে, তিন দশক ধরে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের বদলে কোটি কোটি পাউন্ড বিনিয়োগকারীদের কাছে চলে গেছে। এর ফলে জনগণ এখন একসঙ্গে লিকেজ, দূষণ এবং বাড়তি বিলের বোঝা বহন করছে।

অতিরিক্ত অনুমোদিত অর্থের মধ্যে ১.২ বিলিয়ন পাউন্ড পানি পরিষেবা ও সম্পদ সুরক্ষায়, ৪৭৭ মিলিয়ন পাউন্ড নতুন আবাসন ও ডেটা সেন্টার উন্নয়নে এবং ৩৪ মিলিয়ন পাউন্ড পানীয় জলের বিষাক্ত রাসায়নিক কমানোর কাজে ব্যয় করা হবে। এই ঘোষণা এমন সময় এসেছে, যখন সরকারি তথ্য বলছে ইংল্যান্ডের সব জলাশয়ই কোনো না কোনো মাত্রায় বিষাক্ত রাসায়নিক দ্বারা দূষিত।

অফওয়াটের নির্বাহী পরিচালক হেলেন ক্যাম্পবেল বলেছেন, অতিরিক্ত অর্থের অনুমোদনের ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো বিলম্ব ছাড়াই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তবে কোম্পানিগুলো প্রতিশ্রুত উন্নতি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে অনুমোদিত অর্থ ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে।

এদিকে পরিবেশ সচিব অ্যাঞ্জেলা ঈগল স্বীকার করেছেন, দেশের মানুষ প্রতিটি পাউন্ডের হিসাব করে চলছেন। তার মতে, দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণেই আজকের এই সংকট তৈরি হয়েছে, যার চাপ এখন সাধারণ পরিবারের ওপর গিয়ে পড়ছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্য সফরে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট, রাস্তায় বিক্ষোভ

যুক্তরাজ্যে ফুসফুস ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধে নেমেছে এনএইচএস

জেনে নিন যুক্তরাজ্যের মেরিট স্কলারশিপ সম্পর্কে

নিউজ ডেস্ক