16.2 C
London
September 26, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ভয়াবহ মোবাইল ফোন চোরাচালান চক্রঃ চুরি ৪০ হাজার ফোন—চীনে পাচার

যুক্তরাজ্য থেকে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার চুরি করা মোবাইল ফোন চীনে পাচারের অভিযোগে তিন ব্যক্তিকে মোট ২৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মেট্রোপলিটন পুলিশের দাবি, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে লন্ডনে চুরি হওয়া মোবাইল ফোনের প্রায় ৪০ শতাংশের সঙ্গে এই চক্রের সম্পৃক্ততা ছিল।

সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে মামলার শুনানিতে জানানো হয়, তদন্তের সময় ৫ হাজারের বেশি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ৫৫ লাখ পাউন্ড। চক্রটির মাধ্যমে পাচার হওয়া ফোনগুলোর বেশিরভাগই ছিল আইফোন।

আদালতকে জানানো হয়, রাস্তার পর্যায়ের ফোন চোরদের প্রতি চুরি করা ফোনের জন্য সর্বোচ্চ ৩০০ পাউন্ড পর্যন্ত দেওয়া হতো। পরে এসব ফোনের কিছু চীনে সর্বোচ্চ ৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়েছে বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

মেট্রোপলিটন পুলিশ আমির খাদিকেল, ইসমাত মিয়াখেল ও মনসুর মোহাম্মদকে ‘যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফোন চোরাচালান চক্রের’ সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল একটি ‘সুসংগঠিত ও অত্যন্ত দক্ষ অপরাধী চক্র’, যেখানে রাস্তার পর্যায়ের চোর, চুরি করা ফোনের সংগ্রাহক এবং বিদেশে পাচারকারীরা বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করত।

৩৫ বছর বয়সী আমির খাদিকেল, ৩৩ বছর বয়সী ইসমাত মিয়াখেল এবং ৩০ বছর বয়সী মনসুর মোহাম্মদ—তিনজনই চুরি করা পণ্য গ্রহণের ষড়যন্ত্র এবং সংগঠিত অপরাধী দলের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করে দোষী সাব্যস্ত হন।

শুক্রবার সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে বিচারক অ্যাডাম হিডলস্টন খাদিকেলকে ৯ বছর ৬ মাস, মিয়াখেলকে ৯ বছর এবং মোহাম্মদকে ৬ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড দেন। বিচারক বলেন, আর্থিক দিক থেকে অপরাধের মাত্রা ছিল ‘বিশাল’ এবং অপরাধটি ছিল ‘অত্যন্ত সংগঠিত ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত’।

মেট্রোপলিটন পুলিশের তদন্ত শুরু হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। হিথ্রো বিমানবন্দরের কাছে একটি গুদামে হংকংয়ে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা বাক্স থেকে ৮৬৫টি স্মার্টফোন উদ্ধার করা হয়। ফোনগুলো অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে মোড়ানো ছিল, যা মোবাইল ও ওয়াই-ফাই সিগন্যাল আটকে দিতে পারে।

একজন ফোন চুরির শিকার ব্যক্তি তার চুরি যাওয়া ফোনের অবস্থান শনাক্ত করে সেটি হিথ্রোর একটি ডিএইচএল লজিস্টিকস কেন্দ্রে রয়েছে বলে জানতে পারেন। তার যোগাযোগের পর চালানটি তল্লাশি করে পুলিশ। এতে দেখা যায়, প্রায় সব ফোনই চুরি করা। এরপরই ‘অপারেশন ইকোস্টিপ’ নামে তদন্ত শুরু হয়।

তদন্তে পুলিশ চুরি করা ফোন সরবরাহের একটি বিস্তৃত চেইনের সন্ধান পায়। রাস্তার পর্যায়ের চোরেরা ফোন চুরি করার পর সেগুলো বিভিন্ন সংগ্রাহক বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে সরবরাহ করত। পরে ফোনগুলো চক্রের পরবর্তী পর্যায়ের সদস্যদের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হতো।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব লন্ডনের লি ব্রিজ রোডে ‘রোশান ড্রাই ফ্রুটস অ্যান্ড নাটস’ নামের একটি দোকানে তল্লাশি চালায় পুলিশ। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানটি খাদিকেল ও মিয়াখেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সংরক্ষণস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

দোকানের ভেতরে একটি খোলা ‘ট্র্যাপ ডোর’ দিয়ে বেসমেন্টে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সেখানে পুলিশ অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে মোড়ানো স্মার্টফোন এবং ৪৪ হাজার ৬৬৫ পাউন্ড নগদ অর্থ উদ্ধার করে।

গ্রেপ্তারের সময় খাদিকেল ও মিয়াখেলের কাছে সিম কার্ড বের করার যন্ত্রযুক্ত নেকলেস পাওয়া যায় বলে আদালতকে জানানো হয়।

মিয়াখেলের মোবাইল ফোনে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত চুরি করা ফোন সরবরাহকারীদের মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ পাউন্ড অর্থ পরিশোধের বিষয়ে বার্তা পাওয়া যায়।

আদালতে আরও জানানো হয়, মনসুর মোহাম্মদ চক্রটির মধ্যবর্তী পর্যায়ে কাজ করতেন। তিনি রাস্তার পর্যায়ের চোরদের কাছ থেকে ফোন সংগ্রহ করে খাদিকেল ও মিয়াখেলের কাছে সরবরাহ করতেন এবং এর মাধ্যমে লাভ করতেন।

২০১৯ সালে ভিসা নিয়ে ভারত থেকে যুক্তরাজ্যে আসা মোহাম্মদকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তিনি একটি টয়োটা এস্টিমা গাড়ি চালাচ্ছিলেন। গাড়ির গ্লাভ বক্সে ছয়টি ফ্যারাডে ব্যাগ, সাত রোল অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল এবং কয়েকটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়।

আদালতকে জানানো হয়, মোহাম্মদ আগে একটি মোবাইল ফোন মেরামতের দোকানে কাজ করতেন। ওই কাজের সূত্রে তিনি চুরি করা ফোন বিক্রি করতে চাওয়া ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসেন বলে প্রসিকিউশন জানায়।

ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের সাইরা পাইক বলেন, ফোন চুরি শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়; এতে ভুক্তভোগীরা ব্যক্তিগত তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও স্মৃতি এবং নিরাপত্তাবোধও হারাতে পারেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, খাদিকেল, মিয়াখেল ও মোহাম্মদ লন্ডনজুড়ে মোবাইল ফোন চুরির শিকার ব্যক্তিদের দুর্ভোগ থেকে লাভবান হওয়া একটি সুসংগঠিত অপরাধী চক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।

তদন্তে উঠে আসে, খাদিকেল এর আগেও ২০২২ সালের মার্চে চুরি করা পণ্য গ্রহণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সে সময় তার কাছে ১৪টি ফোন পাওয়া যায় এবং ফোনগুলো রান্নাঘরের ফয়েলে মোড়ানোর অবস্থায় ছিল।

খাদিকেলের আইনজীবী আদালতে বলেন, তিনি ২০১৯ সালে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে এসেছিলেন এবং তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে আফগানিস্তানে রেখে এসেছিলেন। আইনজীবীর দাবি, খাদিকেল জানতেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফোন চুরি করে সংগ্রহ ও বিদেশে পাঠানো হচ্ছে, তবে পুরো চক্রের ব্যাপ্তি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।

মিয়াখেলের আইনজীবী বলেন, তিনি চক্রটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও মূল নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল না এবং তিনি তার কর্মকাণ্ডের জন্য অত্যন্ত দুঃখিত।

অন্যদিকে মোহাম্মদের আইনজীবী বলেন, তিনি ফোন সংগ্রহ করে বিক্রি করার কথা স্বীকার করেছেন, তবে তিনি এই অপরাধী চক্রের নেতা ছিলেন না।

মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে চুরি হওয়া হাজার হাজার মোবাইল ফোনের আন্তর্জাতিক পাচারের সঙ্গে যুক্ত একটি বিস্তৃত সরবরাহব্যবস্থার তথ্য পাওয়া গেছে। আদালতের রায়ে তিন অভিযুক্তের দীর্ঘ কারাদণ্ডের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ার এই পর্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যের রিফর্ম পার্টির দাবি—দুই–দলের রাজনীতির যুগ শেষ, রিফর্ম এখন শীর্ষে

মেধাবীদের জন্য ভিসা ফি বাতিল করতে পারে যুক্তরাজ্যঃ রিপোর্ট

১৫ দেশের রাজা হচ্ছেন কিং চার্লস