17.4 C
London
June 4, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটিশ রাজনীতিতে ‘বিগ মানি’ বিতর্ক তীব্রঃ রিফর্ম ইউকের তহবিলে ৯০ লাখ পাউন্ড

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্রুত উত্থান ঘটানো রিফর্ম ইউকে আবারও আলোচনায় এসেছে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত অনুদান সংগ্রহের কারণে। দেশটির সর্বশেষ রাজনৈতিক অর্থায়ন সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে দলটি প্রায় ৯০ লাখ পাউন্ড অনুদান পেয়েছে, যা একই সময়ে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি এবং বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির সংগ্রহ করা অর্থের দ্বিগুণেরও বেশি।

নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য বলছে, নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকের তহবিলে সবচেয়ে বড় অবদান এসেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের দুই ধনকুবেরের কাছ থেকে। এর মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বিমান খাতের বিনিয়োগকারী ক্রিস্টোফার হারবর্ন দিয়েছেন ৩০ লাখ পাউন্ড এবং ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা বেন ডেলো দিয়েছেন ৪০ লাখ পাউন্ড। এই দুই ব্যক্তির অনুদানই চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্রিটিশ রাজনীতিতে প্রবাহিত মোট ব্যক্তিগত অর্থের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূলধারার রাজনীতির বাইরে অবস্থান নেওয়া রিফর্ম ইউকের প্রতি ধনী বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, করনীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী অবস্থানের কারণে দলটি ডানপন্থী ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে, যা বড় অঙ্কের অনুদান সংগ্রহে সহায়তা করছে।

তবে এই বিপুল অর্থায়ন নতুন বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। ক্রিস্টোফার হারবর্নের কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ৫০ লাখ পাউন্ডের সুবিধা গ্রহণের অভিযোগে নাইজেল ফারাজ বর্তমানে সংসদের স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনারের তদন্তের মুখোমুখি রয়েছেন। ফারাজ দাবি করেছেন, অর্থের একটি অংশ তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ধনী দাতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

রিফর্ম ইউকের আরেক বড় দাতা ডেভিড গ্রেইঞ্জার, যিনি স্বাস্থ্য, বায়োটেকনোলজি এবং দীর্ঘায়ু গবেষণায় বিনিয়োগের জন্য পরিচিত। তিনি দলটিকে ১০ লাখ পাউন্ড অনুদান দিয়েছেন। এছাড়া নতুন দাতাদের মধ্যে রয়েছেন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান নিউ ওয়েভ গ্লোবালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নাভরোজ উদওয়াদিয়া এবং একাধিক আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী।

অন্যদিকে লেবার পার্টি ও কনজারভেটিভ পার্টির অনুদান সংগ্রহ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। প্রথম প্রান্তিকে উভয় দলই প্রায় ৪০ লাখ পাউন্ড করে ব্যক্তিগত অনুদান পেয়েছে। লেবারের প্রধান দাতাদের মধ্যে ছিলেন দীর্ঘদিনের সমর্থক ডেভিড সেইন্সবুরি, গ্যারি লাবনার এবং বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন। কনজারভেটিভদের সবচেয়ে বড় অনুদান এসেছে মেরি ভি ডোরান নামের এক দাতার কাছ থেকে, যার পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ পাউন্ড।

রাজনৈতিক অর্থায়ন নিয়ে কাজ করা দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন স্পটলাইট অন করাপশন সতর্ক করে বলেছে, অল্প কয়েকজন ধনী ব্যক্তির হাতে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন কেন্দ্রীভূত হওয়া গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সুসান হাওলির মতে, বিপুল আর্থিক সক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা যদি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান অর্থদাতা হয়ে ওঠেন, তাহলে সাধারণ জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব কেনাবেচার ধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকার রাজনৈতিক অনুদান ব্যবস্থায় কিছু সংস্কারের কথা ভাবছে। বিশেষ করে বিদেশি উৎস থেকে অনুদান গ্রহণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে রাজনৈতিক অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক জ্যাকি কিলিন বলেছেন, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলো মোট ২ কোটি ৪৭ লাখ পাউন্ড অনুদান গ্রহণ করেছে। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক অর্থায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা ভোটারদের আস্থা ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট ডি-স্মগের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম জিবি নিউজ রিফর্ম ইউকের সংসদ সদস্যদের ১০ লাখ পাউন্ডেরও বেশি অর্থ প্রদান করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে নাইজেল ফারাজ প্রায় ৭ লাখ পাউন্ড এবং দলটির আরেক এমপি লি অ্যান্ডারসন প্রায় ৩ লাখ পাউন্ড আয় করেছেন।

এসব তথ্য সামনে আসার পর ব্রিটেনে রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা, ধনী দাতাদের প্রভাব এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে অর্থের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে এই বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থের উৎস নিয়ে জনসাধারণের নজরদারি আরও বাড়বে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে রাশিয়ার আক্রমণের আশঙ্কা

যুক্তরাজ্যের হিথ্রোতে ডিজিটাল লেনঃ পাসপোর্ট কন্ট্রোলে এআই ক্যামেরায় যাত্রী যাচাই

যুক্তরাজ্যে আন্ডারকভার পুলিশদের যৌন প্রতারণাঃ স্পাইকপস তদন্তে বিস্ফোরক তথ্য