যুক্তরাজ্যে মানবপাচার বা আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া কোনো ব্যক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এর অর্থ এই নয় যে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশটিতে আশ্রয় পাওয়ার অধিকারী হয়ে গেছেন। অভিবাসন আইনবিষয়ক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মানবপাচারের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত অতীতে একজন ব্যক্তি শোষণের শিকার হয়েছেন—এটি প্রমাণ করতে সহায়তা করে; কিন্তু আশ্রয়ের আবেদনে মূল প্রশ্ন হলো, নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হলে ভবিষ্যতে তিনি নির্যাতন বা নিপীড়নের বাস্তব ঝুঁকিতে পড়বেন কি না।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থা মানবপাচার ও আধুনিক দাসত্বের সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্ত ও স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে শরণার্থী মর্যাদা নির্ধারণ করা হয় শরণার্থী কনভেনশনের আলাদা আইনি কাঠামোর অধীনে। সেখানে কোনো ব্যক্তিকে দেখাতে হয়, নিজ দেশে ফেরত গেলে জাতি, ধর্ম, জাতীয়তা, রাজনৈতিক মতাদর্শ অথবা কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার কারণে তার ওপর নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে মানবপাচারের স্বীকৃতি পাওয়ার পর আশ্রয়ের আবেদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি। পাচারকারী চক্র এখনও সক্রিয় কি না, তাদের পক্ষ থেকে প্রতিশোধের আশঙ্কা রয়েছে কি না, পরিবারের সদস্য বা স্থানীয় সমাজ থেকে হুমকি আসতে পারে কি না এবং যে পরিস্থিতির কারণে ওই ব্যক্তি আগে পাচারের শিকার হয়েছিলেন, তা এখনও বিদ্যমান কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে।
তবে ভবিষ্যতে বিপদের আশঙ্কা থাকলেই শরণার্থী মর্যাদা পাওয়া যায় না। সেই ঝুঁকিকে শরণার্থী কনভেনশনে স্বীকৃত পাঁচটি নির্দিষ্ট কারণের অন্তত একটির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হয়। মানবপাচারের ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে ‘নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্যপদ’ একটি সম্ভাব্য ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, লিঙ্গ, সামাজিক পরিচয় এবং নিজ দেশের বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে বিষয়টি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ আদালতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ও প্রাসঙ্গিক। ‘শাহ ও ইসলাম’ এবং ‘ফোরনাহ’ মামলার রায়ে নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠী নির্ধারণের ক্ষেত্রে লিঙ্গ, পরিবর্তন করা সম্ভব নয় এমন বৈশিষ্ট্য এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির মতো বিষয় বিবেচনার গুরুত্ব উঠে এসেছে। ফলে শুধু ‘আমি মানবপাচারের শিকার’—এই বক্তব্য আশ্রয়ের জন্য যথেষ্ট নয়; কেন এবং কীভাবে ওই ব্যক্তির ওপর ভবিষ্যতে নির্যাতনের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, তার সঙ্গে শরণার্থী কনভেনশনের কোনো ভিত্তির সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও ব্যাখ্যা করতে হবে।
আশ্রয়ের দাবিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা। কোনো দেশে মানবপাচারবিরোধী আইন বা বিশেষ পুলিশ ইউনিট থাকলেই ধরে নেওয়া যায় না যে ভুক্তভোগী কার্যকর সুরক্ষা পাবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পক্ষে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা নিরাপদ কি না, কর্তৃপক্ষ অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত ও ব্যবস্থা নেয় কি না এবং বাস্তবে ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় আসবে।
এর পাশাপাশি নিজ দেশের অন্য কোনো এলাকায় গিয়ে নিরাপদে বসবাস করা সম্ভব কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হতে পারে। তবে শুধু অন্য শহর বা অঞ্চলে চলে যাওয়ার সুযোগ থাকলেই সেটিকে কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাস্তবে নিরাপদে এবং যুক্তিসংগতভাবে বসবাস করতে পারবেন কি না, তার আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কী, প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন কি না এবং পাচারকারী চক্রের প্রভাব ওই এলাকাতেও রয়েছে কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে মানবপাচারের সঙ্গে সংগঠিত অপরাধী চক্র জড়িত থাকলে অভ্যন্তরীণভাবে স্থানান্তরের বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে। একইভাবে একজন ভুক্তভোগীর দুর্বলতা, আর্থিক অসচ্ছলতা, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং সামাজিক সহায়তার অভাবও নতুন জায়গায় নিরাপদে বসবাসের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
আইনি বিশ্লেষণে তাই বলা হয়েছে, মানবপাচারের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্তকে একদিকে যেমন আশ্রয়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাবে না, অন্যদিকে এটিকে গুরুত্বহীনও ভাবা যাবে না। অতীতে একজন ব্যক্তি যে শোষণের শিকার হয়েছেন, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মূল্যায়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ফলে যুক্তরাজ্যে মানবপাচারের শিকার কোনো ব্যক্তি আশ্রয়ের আবেদন করলে তার মামলায় অতীতে কী ঘটেছিল—এর পাশাপাশি দেশে ফেরার পর কী ঘটতে পারে, কেন সেই ঝুঁকি তৈরি হবে, সেই ঝুঁকি শরণার্থী কনভেনশনের কোনো ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত কি না, নিজ দেশের সরকার কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারবে কি না এবং দেশের অন্য অংশে নিরাপদে বসবাস করা সম্ভব কি না—সবগুলো বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে।
অভিবাসন আইনজীবীদের জন্যও এর অর্থ হলো, শুধু জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থার ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর না করে একটি পূর্ণাঙ্গ আশ্রয় দাবি তৈরি করতে হবে। অতীতের মানবপাচারের প্রমাণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নির্যাতনের আশঙ্কা, দেশের পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাস্তবতা এবং অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের সম্ভাবনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করাই হবে মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অর্থাৎ, যুক্তরাজ্যে মানবপাচারের স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা ও প্রমাণ হলেও সেটি নিজে থেকে শরণার্থী মর্যাদা নিশ্চিত করে না। মানবপাচার আইন ও আশ্রয় আইন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও দুটি পৃথক আইনি কাঠামো। তাই মানবপাচারের ইতিবাচক সিদ্ধান্তকে আশ্রয় মামলার শেষ ধাপ নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও শরণার্থী মর্যাদা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা হবে।
সূত্রঃ ফ্রি মুভমেন্ট
এম.কে

