TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে সামনে কঠিন কয়েক বছরঃ ২০২৯ সালের মধ্যে পরিবারের আয় কমতে পারে ১,০৫০ পাউন্ড

যুক্তরাজ্যে আগামী কয়েক বছর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতি বিশ্লেষক ও গবেষণা সংস্থাগুলো। দেশটিতে জীবনযাত্রার মানের উন্নতি প্রায় থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির বাড়তি দাম এবং ঋণ নেওয়ার উচ্চ ব্যয় সাধারণ পরিবারের আর্থিক অবস্থার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

যুক্তরাজ্যের গবেষণা সংস্থা রেজল্যুশন ফাউন্ডেশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এখন থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত কর্মক্ষম বয়সী একটি সাধারণ পরিবারের কর ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনার পর ব্যয়যোগ্য আয় ১ হাজার ৫০ পাউন্ড বা প্রায় ৩ শতাংশ কমে যেতে পারে। অন্যদিকে, ইনস্টিটিউট ফর ফিসকাল স্টাডিজ বলেছে, চলতি দশকটি পরিবারের আয়ের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে রেকর্ডে সবচেয়ে খারাপ দশক হয়ে উঠতে পারে।

দেশটির অর্থনৈতিক পূর্বাভাস তৈরির দায়িত্বে থাকা অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র বেশ হতাশাজনক। সংস্থাটির মতে, উচ্চ ঋণ গ্রহণের ব্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে।

জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমাতে সরকার প্রায় ১০০ পাউন্ডের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। প্রায় ২ কোটি পরিবার এই সহায়তা পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে রেজল্যুশন ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই অর্থ জ্বালানির বাড়তি বিলের সম্পূর্ণ চাপ সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে না। সংস্থাটি মনে করে, সবচেয়ে কম আয়ের পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করে আরও কার্যকর সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন ছিল।

রেজল্যুশন ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী রুথ কার্টিস বলেছেন, বর্তমান সংসদের মেয়াদকে ক্রমেই দুটি ভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা যাচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল এবং সরকারি পরিষেবায় অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে পরিস্থিতি অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সংস্থাটির হিসাবে, বর্তমান সংসদের পুরো মেয়াদে পেনশনভোগী নন—এমন পরিবারগুলোর কর, সরকারি সুবিধা ও আবাসন ব্যয় বিবেচনার পর প্রকৃত আয় মোটে প্রায় ৬০০ পাউন্ড বাড়বে। তাদের মতে, আয়ের যে সামান্য উন্নতি হয়েছে, তার বড় অংশ ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়ে গেছে। ফলে সামনে পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা সীমিত।

২০২৭ সালে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটির হিসাবে, ২০২৬ সালে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে, যা ২০২৭ সালে কমে ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে। গত মার্চের পূর্বাভাসের তুলনায় আগামী বছরের প্রবৃদ্ধির এই হিসাব উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

একই সঙ্গে ২০২৭ সালের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, পণ্য ও পরিষেবার দাম বাড়ার গতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হতে পারে। এদিকে, করের নির্দিষ্ট সীমা দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত থাকায় আয় বাড়লেও অনেক মানুষের হাতে থাকা প্রকৃত অর্থের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি জানিয়েছে, দশকের শেষ নাগাদ যুক্তরাজ্যের সব পরিবারের জীবনযাত্রার মান বছরে গড়ে ০.১ শতাংশেরও কম হারে বাড়তে পারে। এই হিসাবের মধ্যে পেনশনভোগী পরিবারও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংস্থাটি স্বীকার করেছে, ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির গতিপথ নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো বা খারাপ—দুই-ই হতে পারে।

ইনস্টিটিউট ফর ফিসকাল স্টাডিজের পরিচালক হেলেন মিলার বর্তমান পরিস্থিতিকে হতাশাজনক বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, সাময়িকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর কিছু পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের দুর্বল প্রবৃদ্ধির সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য আরও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। হেলেন মিলারের মতে, সরকারি ব্যয়ের পরিকল্পনা অত্যন্ত কঠোর এবং সরকার শেষ পর্যন্ত এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, এই ব্যয় পরিকল্পনার সঙ্গে সরকারের ঋণ কমানোর লক্ষ্য সরাসরি সম্পর্কিত।

বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী জন হিলি বলেন, ইরান যুদ্ধ এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের মতো আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। তার দাবি, সরকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে এবং জ্বালানি বিলের সহায়তা পরিবারগুলোকে সাময়িক স্বস্তি দেবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি দূর করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া অর্থমন্ত্রী অ্যান্ড্রু গ্রিফিথ বলেছেন, সরকারের বাজেট দেশের সরকারি অর্থব্যবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছে। তার অভিযোগ, সরকার রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে থাকা আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা বা অতিরিক্ত অর্থের ব্যবধান কমিয়ে দিয়েছে।

লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের নেতা এড ডেভি বলেছেন, ১০০ পাউন্ডের জ্বালানি সহায়তা অনেক পরিবারের কাছে বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হতে পারে। তবে বেতন থেকে পরোক্ষভাবে বেশি কর কেটে নেওয়ার প্রভাব বিবেচনায় নিলে এই সহায়তা যথেষ্ট নয়।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি সামনে এমন এক সময়ের মুখোমুখি হতে পারে, যখন প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং পরিবারের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির গতি কমে যাবে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সাময়িক আর্থিক সহায়তা কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং পরিবারের আয় বৃদ্ধির স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্রঃ বিবিসি নিউজ

এমকে

আরো পড়ুন

ট্রাম্পের সমর্থন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই ইউক্রেনকে আরও ক্ষেপণাস্ত্র দিচ্ছে ব্রিটেন

পাবলো এসকোবারের ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করা ভয়ঙ্কর ড্রাগলর্ডকে যুক্তরাজ্যে কারাদণ্ড

রানির স্বাস্থ্যের অবনতি, উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরা

অনলাইন ডেস্ক