তীব্র তাপদাহ, নজিরবিহীন দাবানল এবং ক্রমাবনতিশীল খরা পরিস্থিতির মুখে যুক্তরাজ্যে জাতীয় পর্যায়ের জরুরি সমন্বয় বৈঠক (কোবরা) ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। বুধবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, জরুরি সেবা সংস্থা ও পরিবেশ কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, একযোগে তাপপ্রবাহ, অগ্নিকাণ্ড ও পানির সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নির্ধারণই ছিল বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য।
ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, চলতি গ্রীষ্মে এটি চরম তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় দ্বিতীয় কোবরা বৈঠক। বৈঠকে পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয় (ডেফরা), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সরকার বলেছে, দাবানলের সঙ্গে লড়াই করা দমকলকর্মী, খরায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এবং ব্যস্ত জরুরি বিভাগে কর্মরত এনএইচএস কর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর মেট অফিস সতর্ক করেছে, বৃহস্পতিবার ইংল্যান্ডের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। লন্ডন, দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ড, পূর্বাঞ্চল, ইস্ট মিডল্যান্ডস, ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস এবং সাউথ ইয়র্কশায়ারের জন্য অ্যাম্বার এক্সট্রিম হিট সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রধান পূর্বাভাসকারী ক্রিস বুলমার বলেছেন, উচ্চচাপ বলয় ও ইউরোপ থেকে আসা উষ্ণ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকের বাতাসের কারণে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে।
দাবানলের পরিস্থিতিকে ইতোমধ্যেই ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করেছে ফায়ার ব্রিগেডস ইউনিয়ন। সংগঠনটির মহাসচিব স্টিভ রাইট বলেছেন, “আমরা এখনই একটি জাতীয় জরুরি অবস্থার মধ্যে আছি।”
জাতীয় ফায়ার চিফস কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসেই রেকর্ড ৪৫৮টি দাবানলের ঘটনা ঘটে। আগস্টের প্রথম ১০ দিনেই আরও ১৮৫টি দাবানল নথিভুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে দমকল বাহিনী ৯৫০টিরও বেশি দাবানল মোকাবিলা করেছে।
সাম্প্রতিক বড় ঘটনাগুলোর মধ্যে নিউ ফরেস্টের এ–৩১ সড়কের পাশে বিশাল হিথল্যান্ডে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় বহু চালককে গাড়ি ফেলে সরে যেতে হয় এবং এলাকায় ব্যাপক যান চলাচল বিঘ্নিত হয়। শুষ্ক ঘাস, বনাঞ্চল ও হিথল্যান্ডে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় দমকল বাহিনী বাড়তি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
তাপদাহের পাশাপাশি পানির সংকটও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি জানিয়েছে, রেকর্ড পরিমাণ শুষ্ক জুলাই এবং আগস্টের শুরুতেও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ইংল্যান্ডের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অঞ্চল এখন আনুষ্ঠানিকভাবে খরার আওতায় রয়েছে। টানা সাত সপ্তাহে ১০ মিলিমিটারের কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় জলাধার, নদীর প্রবাহ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেড়েছে।
পানির সরবরাহ সচল রাখতে ন্যাশনাল ড্রট গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন পানি কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি। জুলাইয়ের শেষ দিকে যেখানে প্রায় অর্ধেক ইংল্যান্ড খরায় ছিল, সেখানে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
মেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এটি চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাজ্যের পঞ্চম তাপপ্রবাহ। জুন মাসে হ্যাম্পশায়ারের গোসপোর্টে ৩৬ দশমিক ১ ডিগ্রি এবং পরদিন সমারসেটের মেরিফিল্ডে ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছিল। সে সময় ১৫০টিরও বেশি আবহাওয়া কেন্দ্র তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ জুন তাপমাত্রা রেকর্ড করে। তবে যুক্তরাজ্যের সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এখনও ২০২২ সালে লিংকনশায়ারের কনিংসবিতে রেকর্ড হওয়া ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
দমকল বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপের কথা উল্লেখ করে ফায়ার ব্রিগেডস ইউনিয়ন হাজারো নতুন দমকলকর্মী নিয়োগ এবং বিশেষায়িত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামে অতিরিক্ত বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছে। সরকার এর আগে দাবানল মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে ৯ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা (ইউকেএইচএসএ) হিট-হেলথ সতর্কতা জারি করে জনগণকে পর্যাপ্ত পানি পান, বয়স্ক ও অসুস্থ স্বজনদের খোঁজ রাখা এবং জরুরি সেবা ও আবহাওয়া সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত গরমের কারণে হিট এক্সহস্টশন, পানিশূন্যতা এবং অন্যান্য তাপজনিত অসুস্থতা বাড়তে পারে, যা হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
সরকার জানিয়েছে, কোবরা বৈঠকে দাবানল মোকাবিলা, পানির সরবরাহ, জরুরি সেবার সক্ষমতা এবং তাপপ্রবাহের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা না থাকায় আগামী কয়েক দিনে আরও দাবানলের আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় শুকনো ঘাস বা বনাঞ্চলে আগুন কিংবা বারবিকিউ না জ্বালাতে এবং জরুরি সংস্থার সব ধরনের সতর্কতা মেনে চলতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
সূত্রঃ ক্রাইম ওয়াচ
এম.কে

