প্রাচীন মিশরের ফারাও তুতানখামুনের সমাধিকে ঘিরে ‘ফারাওয়ের অভিশাপ’-এর গল্প বহু বছর ধরে মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। সমাধি আবিষ্কারের পর অভিযানের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের মৃত্যু সেই রহস্যকে আরও গভীর করেছিল। এবার সেই ইতিহাসের সঙ্গে আলোচিত একটি ছত্রাকের মধ্যেই ক্যানসার চিকিৎসার সম্ভাবনাময় যৌগ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণার কেন্দ্রে থাকা ছত্রাকটির বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাসপারজিলাস ফ্ল্যাভাস (Aspergillus flavus)। এটি সাধারণত মাটি ও কৃষিজ পরিবেশে পাওয়া যায় এবং কিছু পরিস্থিতিতে মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে এই ছত্রাকের ভেতরেই এমন জটিল রাসায়নিক যৌগ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে ক্যানসারের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
২০২৫ সালের ২৩ জুন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কেমিক্যাল বায়োলজিতে প্রকাশিত গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বাধীন গবেষকরা অ্যাসপারজিলাস ফ্ল্যাভাস থেকে চারটি নতুন ছত্রাকজাত যৌগ শনাক্ত করেন। এগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে অ্যাসপারজিমাইসিন এ, বি, সি ও ডি—বা অ্যাসপারজিমাইসিনস।
গবেষণায় দেখা যায়, চারটি যৌগের মধ্যে বিশেষ করে অ্যাসপারজিমাইসিন সি ও ডি বিভিন্ন লিউকেমিয়া কোষের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য বিষক্রিয়ামূলক বা কোষ-ধ্বংসকারী কার্যকারিতা দেখিয়েছে। গবেষকেরা মানুষের বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার কোষের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, এসব যৌগের মধ্যে কিছু যৌগ লিউকেমিয়া কোষের বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে যৌগটির রাসায়নিক কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা অ্যাসপারজিমাইসিন বি-কে পরিবর্তন করে এর সঙ্গে একটি লিপিড বা চর্বিজাত অণু যুক্ত করেন। তৈরি করা এই নতুন যৌগটির নাম দেওয়া হয় টু-এল-সিক্স (২-L₆)। পরীক্ষাগারে এটি ন্যানোমোলার মাত্রায় ক্যানসারবিরোধী কার্যকারিতা দেখায় এবং অনুমোদিত কিছু অ্যান্টি-লিউকেমিয়া ওষুধের সঙ্গে তুলনীয় শক্তি প্রদর্শন করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, টু-এল-সিক্স কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে এসএলসি৪৬এ৩ (SLC46A3) নামের একটি পরিবহনকারী প্রোটিনের ভূমিকা রয়েছে। ক্রিসপার স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই পরিবহন ব্যবস্থার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। এর ফলে ভবিষ্যতে এই ধরনের জটিল ছত্রাকজাত যৌগকে ক্যানসার চিকিৎসার উপযোগী করে তোলার পথ আরও পরিষ্কার হতে পারে।
এই যৌগগুলোকে বিজ্ঞানীরা রাইবোসোমালি সিনথেসাইজড অ্যান্ড পোস্ট-ট্রান্সলেশনালি মডিফায়েড পেপটাইডস, সংক্ষেপে রিপস (RiPPs) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। সহজ ভাষায়, এগুলো অণুজীবের তৈরি অত্যন্ত জটিল পেপটাইডজাত অণু, যেগুলোর রাসায়নিক কাঠামো সাধারণভাবে তৈরি বা আলাদা করা অত্যন্ত কঠিন। গবেষণাটি দেখিয়েছে, ছত্রাক থেকেও এমন জটিল ও সম্ভাবনাময় যৌগ পাওয়া সম্ভব।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বলছেন, প্রকৃতি থেকে নতুন ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে ছত্রাক একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষকেরা অ্যাসপারজিলাস ফ্ল্যাভাস থেকে নতুন শ্রেণির অণু আলাদা করে সেগুলো পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংসে সক্ষম একটি যৌগ তৈরি করেছেন।
তবে গবেষণাটি মূলত পরীক্ষাগারে ক্যানসার কোষের ওপর পরিচালিত হয়েছে। মানুষের শরীরে এই যৌগ কতটা নিরাপদ ও কার্যকর, তা জানতে আরও বিস্তৃত প্রাক-ক্লিনিক্যাল গবেষণা এবং পরবর্তীতে মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।
অর্থাৎ, তুতানখামুনের সমাধির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘অভিশাপ’ থেকে সরাসরি ক্যানসারের ওষুধ তৈরি হয়ে গেছে—বিষয়টি এমন নয়। বরং বিজ্ঞানীরা এমন একটি ছত্রাক থেকে নতুন যৌগ আবিষ্কার করেছেন, যার মধ্যে লিউকেমিয়ার বিরুদ্ধে শক্তিশালী সম্ভাবনা দেখা গেছে। এখন সেই সম্ভাবনাকে নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসায় রূপ দেওয়া সম্ভব কি না, সেটিই পরবর্তী গবেষণার বড় প্রশ্ন।
একসময় যে ছত্রাককে ঘিরে তৈরি হয়েছিল মৃত্যু ও রহস্যের গল্প, আধুনিক বিজ্ঞান এখন সেই একই প্রজাতির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছে জীবন রক্ষার সম্ভাবনা। আর এই আবিষ্কার আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে—প্রকৃতির ক্ষতিকর বলে পরিচিত অণুজীবের মধ্যেও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের উপাদান লুকিয়ে থাকতে পারে।
সূত্রঃ নেচার কেমিক্যাল বায়োলজিতে প্রকাশিত মূল গবেষণা এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদন
এম.কে

