TV3 BANGLA
বাংলাদেশযুক্তরাজ্য (UK)

লন্ডনের বাংলাদেশি পাড়ায় নির্বাচন আলোচনা তুঙ্গেঃ কিন্তু অংশগ্রহণে ভাটা

বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে ব্রিটেনে বসবাসকারী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল ও টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় ক্যাফে, বাজার ও সামাজিক আড্ডায় নির্বাচনের প্রসঙ্গ নিয়মিত আলোচনায় আসছে।

 

শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর এটি যেমন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন, তেমনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ।

দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, বিরোধী দলের বর্জন ও দমন-পীড়নের অভিযোগে দেশে যেমন ভোটারদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল, তেমনি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। সেই বাস্তবতায় বিদেশে বসবাসকারী নাগরিকদের ভোটাধিকার চালু হওয়াকে অনেকেই দেখছেন একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে।

বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্দ্বে আবর্তিত। শেখ হাসিনার শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্তৃত্ববাদ ও রাজনৈতিক দমনের অভিযোগ জোরালো হয়। প্রায় এক দশক প্রান্তিক থাকা বিএনপি এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে পুনরুত্থানের চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ হওয়ায় ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সাত মিলিয়নের বেশি প্রবাসী ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৫ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে, কিছু নির্বাচনী এলাকায় প্রবাসী ভোটাররা ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেন।

তবে যুক্তরাজ্যের চিত্র ভিন্ন। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার বাংলাদেশি বা ব্রিটিশ বাংলাদেশি বসবাস করলেও ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন মাত্র ৩২ হাজারের কিছু বেশি। এই বৈপরীত্য স্পষ্ট করে যে সাংস্কৃতিক পরিচয় থাকলেই রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না।

ভোটারদের অনাগ্রহের পেছনে রয়েছে বাস্তব ও প্রক্রিয়াগত নানা বাধা। ভোট দিতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), বায়োমেট্রিক নিবন্ধন এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। অনেকের কাছে এই প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ। বিশেষ করে বয়স্ক ভোটারদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তরুণ ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের মধ্যেও ভোট নিয়ে আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতির চেয়ে ব্রিটেনের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাদের জীবনে বেশি প্রভাব ফেলে। ফলে তারা ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও অংশগ্রহণে আগ্রহ দেখান না।

অন্যদিকে গালফ দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি। সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা পরিবার ও জীবিকার কারণে দেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকায় তাদের আগ্রহও বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবুও পূর্ব লন্ডনের অনেক প্রবীণ বাংলাদেশির কাছে এই নির্বাচন আবেগ ও স্মৃতির বিষয়। কেউ কেউ বহু বছর পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত। তাদের কাছে এটি কেবল একটি নির্বাচন নয়, বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান।

সব মিলিয়ে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়। তবে কাগজপত্রের জটিলতা, প্রযুক্তিগত বাধা, রাজনৈতিক অনাস্থা ও প্রজন্মগত দূরত্ব—এই সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, ব্রিটেনে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলে। সেই উত্তর নির্ভর করবে ভোটের দিন তারা কতটা সক্রিয়ভাবে তাদের অধিকার প্রয়োগ করেন তার ওপরই।

সূত্রঃ আল জাজিরা

এম.কে

আরো পড়ুন

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইংলিশ চ্যানেল পাড়ির চেষ্টা ৩০ শতাংশ কমেছে

সৌদিতে চাকরি খুঁজছেন টরি এমপি

ILR-এ বড় পরিবর্তনের প্রস্তাবঃ যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হতে নতুন বাধা