যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরে অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র এন্ডি বার্নহ্যাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের কঠোর অভিবাসন সংস্কার পরিকল্পনাকে সমর্থন করছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে। এতে দলটির ভেতরে যারা তুলনামূলক নরম নীতির পক্ষে ছিলেন, তারা বড় ধাক্কা খেয়েছেন।
লেবার পার্টির একটি অংশ মনে করছে, বর্তমান সরকারের নতুন অভিবাসন নীতি অতিরিক্ত কঠোর এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন কৌশলের সঙ্গে মিল রয়েছে।
তবে এন্ডি বার্নহ্যামের অবস্থান ভিন্ন। তিনি মনে করেন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা প্রমাণ করতে না পারলে সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে না।
বার্নহ্যামের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি বলেছেন, অভিবাসন শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি নৈতিক বিষয়ও। মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছাতে হবে যে সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং একই সঙ্গে দেশের স্বার্থও রক্ষা করতে পারে।
বর্তমানে এন্ডি বার্নহ্যাম মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে লেবার প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি নির্বাচিত হলে ভবিষ্যতে লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্যও লড়াই করতে পারেন। এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বকেও তিনি চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে মেকারফিল্ড আসনে তার লড়াই সহজ হবে না। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকের সমর্থন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দলটি ইতোমধ্যেই বার্নহ্যামকে “খোলা সীমান্তের এন্ডি” বলে সমালোচনা শুরু করেছে।
লেবারের প্রচারণা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই এলাকায় অভিবাসন এখন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু। ফলে বার্নহ্যামকে কঠোর কিন্তু ন্যায়সঙ্গত অভিবাসন ব্যবস্থার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হচ্ছে।
শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে স্থায়ী শরণার্থী মর্যাদা বাতিল, আইন ভঙ্গকারী আশ্রয়প্রার্থীদের সরকারি সহায়তা বন্ধ এবং যেসব দেশের পরিস্থিতি পরে নিরাপদ বলে বিবেচিত হবে, সেসব দেশের শরণার্থীদের যুক্তরাজ্য ত্যাগে বাধ্য করা।
এছাড়া বর্তমানে পাঁচ বছরে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, তা অনেকের ক্ষেত্রে বাড়িয়ে দশ বছর করার পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তন যুক্তরাজ্যে ইতোমধ্যে অবস্থানরত বহু মানুষের ওপরও প্রযোজ্য হতে পারে।
এই নীতির বিরুদ্ধে লেবারের ভেতর থেকেই সমালোচনা উঠেছে। দলটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলছেন, এটি ব্রিটিশ মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার অতীত থেকে কার্যকরভাবে স্থায়ী বসবাসের নিয়ম পরিবর্তনকে “অব্রিটিশ” বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে লেবারপন্থী কিছু নেতার অভিযোগ, শিশুদের বহিষ্কারের মতো ধারণা যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতির প্রতিফলন।
তবে দলীয় সদস্যদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, লেবার সমর্থকদের বড় অংশ বর্তমানের মতো অথবা আরও কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে। অনেকেই মনে করছেন, অভিবাসন ইস্যুতে দুর্বল অবস্থান নিলে রিফর্ম ইউকের কাছে ভোট হারানোর ঝুঁকি বাড়বে।
এদিকে এন্ডি বার্নহ্যাম সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের পূর্বের অবস্থান থেকেও কিছুটা সরে এসেছেন। তিনি বলেছেন, নিকট ভবিষ্যতে সেই পথে হাঁটার পক্ষে তিনি নন।
যদিও তিনি শাবানা মাহমুদের সামগ্রিক সংস্কার পরিকল্পনাকে সমর্থন করছেন, তবু কিছু বিষয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে যেসব শরণার্থীর নিজ দেশ পরে নিরাপদ হয়ে উঠবে, তাদের অবস্থান নিয়মিত পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া প্রশাসনিক জটিলতা বাড়াতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন প্রশ্নে লেবারের এই অবস্থান পরিবর্তন দলটির ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে রিফর্ম ইউকের উত্থান এবং ভোটারদের উদ্বেগ মোকাবিলায় দলটি এখন আরও কঠোর অবস্থানের দিকে ঝুঁকছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

