যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। একটি টিকটক চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে গিয়ে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের মৃত্যুর অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মৃত কিশোর জুলস সুইনির মা এলেন রুম অভিযোগ করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঝুঁকি সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্কবার্তা থাকলেও ব্রিটিশ সরকার কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছে। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের আসক্ত করতে পরিকল্পিতভাবে তাদের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এসব মাধ্যম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা উচিত।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর একজন হচ্ছেন এলেন রুম। বৈঠকটি এমন সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে কি না—সে বিষয়ে সরকারের ১২ সপ্তাহব্যাপী পরামর্শ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পথে।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এলেন রুম বলেন, সরকারকে এখন আর সময়ক্ষেপণ না করে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তার ভাষায়, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের জন্য নিরাপদ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলো বন্ধ রাখাই হবে সবচেয়ে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
এদিকে লেবার পার্টির চেয়ারম্যান আনা টারলি বলেছেন, শিশুদের সুরক্ষার প্রশ্নে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন প্রণয়ন করতে সময় নেওয়াও প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, বর্তমান প্রযুক্তিগত বাস্তবতায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ধরনের সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কৌশলকে তামাক শিল্পের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, শিশুদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে আসক্তিকর বৈশিষ্ট্য যোগ করা হচ্ছে।
স্ট্রিটিংয়ের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের ঘুম, মনোযোগ, শিক্ষাজীবন, শারীরিক স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া অনলাইন গ্রুমিং, ক্ষতিকর আচরণ এবং সহিংস প্রবণতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এসব প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি জানান, মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনকালেও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের উদাহরণ টেনে স্ট্রিটিং বলেন, শতভাগ কার্যকর না হলেও এই ধরনের পদক্ষেপ বহু শিশুকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
বর্তমানে ব্রিটিশ সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণ ছাড়াও আরও কয়েকটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে লাইভ সম্প্রচার, অবস্থান শেয়ারিং এবং অসীম স্ক্রলিংয়ের মতো বৈশিষ্ট্যে বয়সভিত্তিক সীমাবদ্ধতা আরোপ।
এছাড়া ব্যবহারকারীদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত কনটেন্ট সরবরাহকারী অ্যালগরিদম সীমিত করা এবং বাধ্যতামূলক স্ক্রিন-টাইম নিয়ন্ত্রণ চালুর বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে শিশু-কিশোরদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

