20 C
London
August 11, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে অভিবাসন জামিনের নতুন নির্দেশনাঃ ২৮ দিনের নিয়মসহ যা জানা জরুরি

যুক্তরাজ্যে অভিবাসন-সংক্রান্ত কারণে আটক ব্যক্তিদের জামিনে মুক্তির সুযোগ রয়েছে। দেশটিতে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষকে অভিবাসন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া অথবা তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আটক রাখা হয়। সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ২৩ হাজার মানুষ অভিবাসন হেফাজতে প্রবেশ করেন, যা তার আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি।

অপরাধের সাজা ভোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলেও যুক্তরাজ্যে অভিবাসন আটকের জন্য একই ধরনের নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সময়সীমা নেই। ফলে কোনো ব্যক্তি কতদিন আটক থাকবেন, তা তার মামলার পরিস্থিতি ও অপসারণের সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অভিবাসন জামিন অনেকের জন্য আটক অবস্থা থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পথ হয়ে উঠেছে।

সাধারণভাবে যুক্তরাজ্যে সাত দিনের বেশি সময় ধরে আটক থাকা ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অভিবাসন জামিনের আবেদন করতে পারেন। সীমান্তে প্রবেশের অনুমতির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আটক ব্যক্তি, নির্বাসনের প্রস্তুতির কারণে আটক ব্যক্তি, অপসারণের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তি কিংবা কোনো বিদেশি অপরাধীকে নির্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আটক রাখা হলে তারাও নির্দিষ্ট আইনি শর্তে জামিনের যোগ্য হতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি কোথায় আটক আছেন—অভিবাসন অপসারণ কেন্দ্র নাকি কারাগারে—সেটি মূল বিষয় নয়। বরং কোন আইনি ক্ষমতার অধীনে তাকে আটক রাখা হয়েছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে অপসারণ বা নির্বাসনের উদ্দেশ্যে আটক ব্যক্তিদের জামিনের জন্য আবেদন করার সুযোগ থাকে।

জামিনের আবেদন করা যায় স্বরাষ্ট্র দপ্তর অথবা প্রথম স্তরের ট্রাইব্যুনালে। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কাছে আবেদন করতে বি-৪০১ ফরম এবং প্রথম স্তরের ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে বি-১ ফরম ব্যবহার করা হয়। ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার আগে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কাছে আবেদন করা বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ একজন আটক ব্যক্তি সরাসরি ট্রাইব্যুনালের কাছেও জামিন চাইতে পারেন।

জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও বিচারিক নির্দেশনায় আটক রাখার পরিবর্তে যুক্তিসংগত বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে কোনো ব্যক্তিকে আটক রাখা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণের দায়িত্ব মূলত স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ওপর থাকে।

তবে জামিনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জামিনের শর্ত ভঙ্গ করে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, অতীতে কোনো অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার ইতিহাস, জামিনে থাকা অবস্থায় নতুন অপরাধ করার সম্ভাবনা, জনস্বাস্থ্য বা জনশৃঙ্খলার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করার ইতিহাস।

কোনো ব্যক্তিকে দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোর বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি শুনানির ২১ দিনের মধ্যে অপসারণের পরিকল্পনা থাকে এবং অপসারণে কোনো আইনি বাধা না থাকে, তাহলে জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সম্মতির প্রয়োজন হতে পারে। তবে কোনো চলমান অভিবাসন আবেদন বা আপিল অপসারণে বাধা তৈরি করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

আটক ব্যক্তির অতীত আচরণও জামিনের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগে অভিবাসন জামিনের শর্ত মেনে চলা, নিয়মিত রিপোর্ট করা এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করার ইতিহাস থাকলে ভবিষ্যতেও শর্ত মেনে চলার সম্ভাবনা বেশি বলে বিবেচনা করা হতে পারে। কোনো রিপোর্টিংয়ে অনুপস্থিত থাকার ঘটনা থাকলে তার যুক্তিসংগত কারণ ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় আসে। স্থায়ী বাসস্থান, ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক এবং চলমান কোনো অভিবাসন আবেদন থাকলে তা পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম হওয়ার পক্ষে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। এমনকি অতীতে কারও বিরুদ্ধে অপরাধ বা পালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস থাকলেও পরবর্তীতে তার ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটলে সেটি জামিনের আবেদনে তুলে ধরা যেতে পারে।

প্রথম স্তরের ট্রাইব্যুনালে জামিনের আবেদন হলে স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে শুনানির আগে একটি জামিন-সারসংক্ষেপ দেওয়ার কথা। এতে আটক রাখার কারণ, অপসারণের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিগুলো তুলে ধরা হয়। তবে বাস্তবে এই সারসংক্ষেপ কখনো শেষ মুহূর্তে দেওয়া হয়, আবার কখনো শুনানির আগে তা পাওয়া যায় না বলেও আইনজীবীদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে।

জামিন-সারসংক্ষেপে থাকা তথ্যও যাচাই না করে গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ স্বরাষ্ট্র দপ্তর কোন তথ্যকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং কোন তথ্য বাদ দিয়েছে, তা জামিনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আবেদনকারী বা তার আইনজীবীর উচিত সারসংক্ষেপে থাকা তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখা এবং ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য থাকলে তা শুনানিতে তুলে ধরা।

আটকের সময়কালও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিচারিক নির্দেশনায় তিন মাসের আটককে উল্লেখযোগ্য এবং ছয় মাসের আটককে দীর্ঘ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ছয় মাসের বেশি সময় আটক রাখার ক্ষেত্রে জননিরাপত্তার মতো শক্তিশালী কারণ প্রয়োজন হতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটক থাকা ব্যক্তির জামিনের আবেদনে আটকের সময়কাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।

জামিন দেওয়া হলেও সাধারণত এক বা একাধিক শর্ত আরোপ করা হয়। এর মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ে কর্তৃপক্ষ বা ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির হওয়া, নির্দিষ্ট ঠিকানায় বসবাস, নিয়মিত রিপোর্ট করা, কাজ বা পড়াশোনার ওপর সীমাবদ্ধতা, নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থান এবং ইলেকট্রনিক নজরদারি অন্যতম।

নির্বাসনের অপেক্ষায় আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ইলেকট্রনিক নজরদারি বাধ্যতামূলক হতে পারে। তবে শুধু অপরাধের ইতিহাস থাকার কারণে প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর এটি বাধ্যতামূলক নয়। কোনো ব্যক্তির ওপর ইতোমধ্যে অপরাধসংক্রান্ত তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা থাকলে অতিরিক্ত নজরদারি প্রয়োজন কি না, সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

জামিনের আবেদনে আর্থিক সহায়তাকারী বা জামিনদার থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তবে কোনো ব্যক্তি আবেদনকারীর জামিনের শর্ত মেনে চলার নিশ্চয়তার জন্য আর্থিক দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত থাকলে তা বিচারকের কাছে ইতিবাচকভাবে বিবেচিত হতে পারে। তবে আর্থিক শর্ত একা জামিনের ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।

আইনজীবীদের জন্য জামিনের আবেদনে সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট যুক্তি উপস্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীর বিরুদ্ধে যদি বাস্তব কোনো ঝুঁকি থাকে, তা এড়িয়ে না গিয়ে স্বীকার করে দেখাতে হবে—কীভাবে নির্দিষ্ট জামিনের শর্তের মাধ্যমে সেই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। স্থায়ী বাসস্থান, পারিবারিক দায়িত্ব বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত পরিস্থিতির পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিও উপস্থাপন করা যেতে পারে।

ট্রাইব্যুনাল জামিন প্রত্যাখ্যান করলে সরাসরি আপিলের সুযোগ নেই। তবে পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটলে নতুন করে জামিনের আবেদন করা যায়। সাধারণভাবে কোনো বিচারক জামিন প্রত্যাখ্যান করার পর ২৮ দিনের মধ্যে নতুন আবেদন করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ হতে পারে, যদি না আবেদনকারী তার পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখাতে পারেন।

নতুন আপিল শুরু হওয়া, অভিবাসন মামলায় নতুন কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া কিংবা অপসারণের পথে নতুন বাধা তৈরি হওয়া—এ ধরনের পরিবর্তন পরবর্তী জামিন আবেদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই আবেদন করার সময় নির্ধারণও পুরো প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাধারণভাবে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তুলনায় প্রথম স্তরের ট্রাইব্যুনালে জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি হতে পারে। তবে প্রত্যেক ব্যক্তির পরিস্থিতি আলাদা হওয়ায় কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জামিন নিশ্চিত—এমন দাবি করা যায় না। মামলার আইনি ভিত্তি, আটকের কারণ, অপসারণের সম্ভাবনা, অতীত আচরণ এবং জামিনের শর্তের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি না—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সূত্রঃ ফ্রি মুভমেন্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন

শিগগিরই অক্সফোর্ডের টিকা নিবেন বরিস জনসন

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাজ্যে অভিবাসন সংকট প্রকটঃ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ৬০০ অভিবাসীর প্রবেশ