সুইডিশ সরকার ব্রেক্সিটের পর ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য আবাসিক অনুমতি নেওয়ার নিয়ম কঠিন ভাবে প্রয়োগ করছে। সুইডেনে বসবসের জন্য আবাসিক অনুমতি নিবন্ধন আবেদন করতে দেরি হওয়ায় কারনে ব্রিটিশ নাগরিকদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। সুইডিশ সরকার আরো কঠোর ভাবে ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য আবাসিক অনুমতি নেওয়ার নিয়ম প্রয়োগ করবে বলে ঘোষনা করেছে। সুইডেনের অভিবাসনমন্ত্রী জোহান সুইডিশ ফোরসেল সংসদে জানান যে সুইডেন ব্রেক্সিট প্রত্যাহার চুক্তির সব শর্ত পূরণ করেছে এবং ইউরোপীয় কমিশনও এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ৭৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক জয়েস থমাস, যিনি সুইডেনে ২১ বছর ধরে বসবাস করছেন। তাকে আগামী ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন যে তার প্রয়াত স্বামী ব্রেক্সিটের পর করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে তাদের কিছুই করতে হবে না।
আরেকটি আলোচিত ঘটনায় জন সেলার্স নামে এক ব্রিটিশ নাগরিককে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যদিও তিনি ১০ বছর বয়স থেকে সুইডেনে বসবাস করছেন।
বামপন্থী দল ভেনস্টার পার্টির এমপি হাকান স্বেনেলিং বলেছেন, সুইডিশ সরকার মনে করছে সব ঠিক আছে, অথচ ব্রিটিশ নাগরিকদের এখনই দেশ থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। তার মতে, সরকারের নিষ্ক্রিয়তাও এক ধরনের পদক্ষেপ এবং সুইডেনের নতুন সরকার ও নতুন অভিবাসনমন্ত্রী প্রয়োজন।
ফোরসেল তার লিখিত উত্তরে সামান্য আশার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সুইডেনের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকার সঠিকভাবে প্রত্যাহার চুক্তি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে। ভবিষ্যতে প্রক্রিয়াটি সহজ করতে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়া যায় কি না, তা সরকার বিবেচনা করছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুইডেন মোট ২,৪৯০ জন ব্রিটিশ নাগরিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে, যা ইইউ’র ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রে মোট বহিষ্কৃত ব্রিটিশ নাগরিকদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
ব্রিটস ইন সুইডেন সংগঠনের ডেভিড মিলস্টেড বলেছেন, সরকারের অবস্থান অপ্রত্যাশিত নয়। তার মতে, এখন প্রশ্ন হলো সুইডেনের নীতি ইইউ আইন এবং ব্রেক্সিট প্রত্যাহার চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্যে যদি এমন নীতি চালু হতো, তাহলে স্বাধীন মনিটরিং অথরিটি (IMA) তা চ্যালেঞ্জ করত।
মিলস্টেডের মতে, সুইডেনের নীতি হয় ইউরোপীয় আদালতে পরীক্ষা করা উচিত, নয়তো সরকারকে অন্য কোনো উপায়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে। সরকারের সাম্প্রতিক মন্তব্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, এবং এতে অন্যায় বহিষ্কার সিদ্ধান্তগুলো সংশোধন করাও অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
ব্রেক্সিটের পর সুইডেন ধীরে ধীরে এমন একটি নীতি ও প্রশাসনিক অবস্থান গ্রহণ করেছে, যা যুক্তরাজ্যের নাগরিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ক্রমশ কঠোর হয়ে উঠছে। অন্যান্য ইইউ সদস্য রাষ্ট্রের তুলনায় সুইডেনের আইন প্রয়োগ ও অভিবাসন নীতির বাস্তবায়ন অনেক বেশি কঠোর, দ্রুত এবং অনমনীয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে—বিশেষ করে ব্রিটিশ নাগরিকদের ক্ষেত্রে।
সুইডেনের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ দেরিতে আবেদন করা ব্রিটিশ নাগরিকদের বিরুদ্ধে যে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা শুধু প্রশাসনিক কঠোরতা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর নীতিগত পরিবর্তনের প্রতিফলন। ব্রেক্সিটের পর সুইডেন যুক্তরাজ্যকে আর আগের মতো অগ্রাধিকারমূলক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে না—এটি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে তাদের সিদ্ধান্ত, আইন প্রয়োগ এবং বিচারিক ব্যাখ্যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের জন্য সুইডেনে বসবাস, কাজ করা, ব্যবসা পরিচালনা করা বা পরিবারভিত্তিক আবাসিক অধিকার বজায় রাখা আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে। সুইডিশ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তগুলো এখন অনেক বেশি কঠোর, এবং প্রশাসনিক নমনীয়তা বা মানবিক বিবেচনার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাজ্যের নাগরিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুইডেনে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত, জটিল প্রক্রিয়া এবং কঠোর আইনগত ব্যাখ্যার মুখোমুখি হতে হবে। ব্রেক্সিট পরবর্তী ইউরোপে সুইডেনের অবস্থান এখন স্পষ্ট—তারা যুক্তরাজ্যের প্রতি আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর নীতি প্রয়োগ করছে, এবং ভবিষ্যতে এই কঠোরতা আরও বাড়তে পারে।

