17.7 C
London
October 13, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আতঙ্কিত রিয়াদঃ বাঙ্কারযুক্ত প্রাসাদে অবস্থান সৌদি যুবরাজের

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ও বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত একাধিক প্রাসাদের মধ্যে অবস্থান পরিবর্তন করছেন। তার নিরাপত্তায় বিশেষভাবে বাছাই করা একটি দল নিয়োজিত রয়েছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর বরাত দিয়ে জানিয়েছে ইসরায়েলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় যুবরাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় সৌদি আরবের বেসামরিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে অন্তত ১২ জন নিহত এবং কয়েক শ মানুষ আহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর ছিল। হামলায় বিমানবন্দরের দুটি টার্মিনাল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়ে। নিহতদের মধ্যে ২৮ বছর বয়সী এক মিসরীয় বিমানবালাও ছিলেন। কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় তার একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।

রোববারও বিমানবন্দর এলাকায় হামলার খবর পাওয়া যায়। বিমানবন্দর বন্ধ থাকার মধ্যেই সেখানে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ আঘাত হানে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে টার্মিনাল ৪-এ আগুন ধরে যায় এবং আরও কয়েকজন আহত হন। ধারাবাহিক এসব হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিমান যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

রিয়াদের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ ও হামলার আশঙ্কায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শহরের আর্থিক অঞ্চলে কর্মরত ব্যক্তিদের পাশাপাশি কয়েকটি আন্তর্জাতিক স্কুলের শিক্ষার্থী ও কূটনীতিকদেরও ভবন ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে অথবা আশ্রয় নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার আকাশে প্রতিহত করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ একটি কিন্ডারগার্টেন ও চিকিৎসাকেন্দ্রের একটি কমপ্লেক্সে আঘাত হানে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হলেও তার ধ্বংসাবশেষ বেসামরিক স্থাপনায় পড়ার ঘটনায় নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি কর্মকর্তারা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত কমে আসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করতে গিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। এ কারণে রাজপ্রাসাদ ও জ্বালানি অবকাঠামোর মতো কৌশলগত স্থাপনার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পর্যটন, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের বৈশ্বিক কেন্দ্রে সৌদি আরবকে পরিণত করতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিওমের মতো ভবিষ্যৎনির্ভর নগর প্রকল্প এবং রাজধানী রিয়াদে একাধিক বৃহৎ উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো হামলার ঝুঁকিতে পড়ায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনেও হামলা চালিয়েছে। এই পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগরের পথ ব্যবহার করে তেল রপ্তানির সুযোগ দেয়। ফলে জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে দেশটির তেল রপ্তানি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়তে পারে।

লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল নিয়ে হুতিদের হুমকিও সৌদি আরবের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিবহন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অক্টোবরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় একটি বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। হামলার কারণে আন্তর্জাতিক যাতায়াত ব্যাহত হওয়া এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও আগ্রহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে এবং কয়েকটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে অথবা পুনর্মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাসের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনীতি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। তবে এই পূর্বাভাসের পেছনে সংঘাতের প্রভাব কতটা, সে বিষয়ে আলাদা করে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

সামরিক পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও সৌদি আরবকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে সামরিক উপদেষ্টা দিলেও ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধারে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার সৌদি অনুরোধে ওয়াশিংটন এখনো সাড়া দেয়নি।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহান্তে জানিয়েছেন, হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ চলছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথভাবে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে হামলায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেননি। রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার পর ট্রাম্প ঘটনাটিকে অত্যন্ত খারাপ বলে মন্তব্য করেন।

এদিকে সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছেও সহায়তা চেয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি সংঘাত নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথও খতিয়ে দেখছে দেশটি।

সব মিলিয়ে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সৌদি আরবের রাজধানীর নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচির ওপর একযোগে চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে যুবরাজের অবস্থান পরিবর্তনের খবর এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঘটনাগুলো দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরবের বিনিয়োগ পরিকল্পনা, তেল রপ্তানি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

সূত্রঃ ওয়াইনেট ও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যের হোম অফিস উইন্ডরাশ প্রতিবেদন প্রকাশ বন্ধে ঢালছে টাকা

দেশ বদলানোর ম্যান্ডেট থেকে সরে দাঁড়াব না—লেবারকে সতর্ক করলেন স্টারমার

নিষেধাজ্ঞার অংশ হিসেবে চেলসির মালিকানা কেড়ে নেওয়ার আহ্বান

অনলাইন ডেস্ক