মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপরিকল্পিত ও কার্যকর কৌশল ছাড়া যুক্তরাজ্য সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না।
তিনি ইঙ্গিত দেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ইরান অভিযান নিয়ে এখনও যথেষ্ট স্পষ্ট ও টেকসই পরিকল্পনা নেই।
সপ্তাহান্তে তেহরানের ওপর হামলায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি এবং শুরুতে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় ট্রাম্প প্রকাশ্যে স্টারমারের সমালোচনা করেন। পরে ইরান অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করলে লন্ডন “সীমিত ও প্রতিরক্ষামূলক” উদ্দেশ্যে মার্কিন বাহিনীকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর পর্বে বিরোধীদলীয় নেতা কেমি ব্যাডেনকের প্রশ্নের জবাবে স্টারমার বলেন, “শনিবার আমি যুক্তরাজ্যকে যুদ্ধে যুক্ত করতে প্রস্তুত ছিলাম না, যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছি যে এর আইনি ভিত্তি রয়েছে এবং একটি কার্যকর, সুপরিকল্পিত রণকৌশল আছে। আমার অবস্থান এখনও সেটাই।”
টোরি ও রিফর্ম ঘরানার একাধিক জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক অভিযোগ করেছেন, স্টারমারের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রিটেনের ‘বিশেষ সম্পর্ক’কে দুর্বল করছে। ট্রাম্প এক পর্যায়ে মন্তব্য করেন, স্টারমার “উইনস্টন চার্চিল নন” এবং তিনি সম্পর্ক নষ্ট করছেন।
এর জবাবে স্টারমার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যৌথ ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে রক্ষায় ব্রিটিশ জেট ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করছে—এটাই বিশেষ সম্পর্কের বাস্তব রূপ। তিনি জানান, প্রতিদিন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান চলছে এবং যৌথ নিরাপত্তা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
হাউস অব কমন্সে তিনি পরিস্থিতিকে “অত্যন্ত গুরুতর” আখ্যা দিয়ে বলেন, অঞ্চলে অবস্থানরত ব্রিটিশ সেনারা তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের সুরক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি জানান, আকাশে টহল জোরদার, আগত হামলা প্রতিহত এবং সাইপ্রাসে অতিরিক্ত সামরিক সক্ষমতা মোতায়েন করা হয়েছে।
শুরুতে আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়ে ব্রিটেন ডিয়েগো গার্সিয়াসহ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান ওশান টেরিটরির ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। পরে রোববার রাতে স্টারমার নির্দিষ্ট ও সীমিত প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমতি দেন।
এই মতপার্থক্যের জেরে ট্রাম্প ব্রিটেনের বিতর্কিত চাগোস চুক্তির প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেন বলে জানা গেছে। চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান ওশান টেরিটরির মালিকানা মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রদূত সাইয়্যেদ আলি মুসাভিকে তলব করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মন্ত্রী হামিশ ফ্যালকনার তার সঙ্গে বৈঠকে বৃহত্তর সংঘাতে অঞ্চলকে জড়ানোর চেষ্টায় ইরানের ভূমিকার নিন্দা জানান এবং বলেন, এতে অঞ্চলে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক ব্রিটিশ নাগরিক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
এদিকে সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ ঘাঁটি আরএএফ আক্রোতিরি ইরানি ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর বিরোধীদের সমালোচনা তীব্র হয়েছে। কেমি ব্যাডেনক অভিযোগ করেন, সরকার কেবল আক্রমণ ঠেকাচ্ছে, কিন্তু হামলাকারীকে থামাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
স্টারমার জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সম্পদ আগাম মোতায়েন করা হয়েছে। একাধিক এফ-৩৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান অঞ্চলজুড়ে সক্রিয় রয়েছে এবং রাতভর অভিযান পরিচালনা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও ঘোষণা দেন, সাইপ্রাস ঘাঁটি সুরক্ষায় টাইপ-৪৫ ডেস্ট্রয়ার এইচএমএস ড্রাগন এবং ওয়াইল্ডক্যাট হেলিকপ্টার পাঠানো হবে। তবে জাহাজটি আগামী সপ্তাহের আগে যাত্রা নাও করতে পারে। বর্তমানে আরএএফ আক্রোতিরি ব্রিটিশ রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও এফ-৩৫ জেট দ্বারা সুরক্ষিত থাকলেও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে এর আশপাশে রয়্যাল নেভির কোনো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন নেই।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

