TV3 BANGLA
আমেরিকা

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার পথে আবদুল এল সাইদ

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন মিশিগানের রাজনীতিক আবদুল এল সাইদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট মনোনয়ন নিশ্চিত করার পর এখন তার সামনে রয়েছে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচন। সেই নির্বাচনে জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়বেন তিনি।

মিশিগানের ডেমোক্র্যাট মনোনয়ন পাওয়ার পর বিজয় ভাষণে নিজের পারিবারিক ইতিহাস তুলে ধরেন এল সাইদ। মিশরীয় অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান এই রাজনীতিক জানান, তার পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো তারও মিশরে ট্যাক্সি চালক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বাবা যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েটে অভিবাসী হয়ে আসায় তার জীবন ভিন্ন পথে এগিয়ে যায়।

তবে শুধু মুসলিম পরিচয় কিংবা মিশরীয় বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণেই এল সাইদ আলোচনায় আসেননি। জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা, কর্পোরেট অর্থের রাজনৈতিক প্রভাবের বিরোধিতা, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধের অবস্থান তাকে আলোচিত করে তুলেছে।

তার নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান বক্তব্য ছিল—রাজনীতি থেকে বড় অর্থের প্রভাব কমিয়ে সেই অর্থ সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির কঠোর সমালোচনা করে তিনি ট্রাম্পবিরোধী ভোটারদেরও আকৃষ্ট করেছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এল সাইদের অবস্থান স্পষ্ট। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের করের অর্থ অন্য দেশের সেনাবাহিনীতে ব্যয় করার বিরোধিতা করেন। তার যুক্তি, জনগণ কর দেয় রাস্তা নির্মাণ, স্কুল সংস্কার ও দেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটানোর জন্য—বিদেশি সামরিক বাহিনীর অস্ত্র কেনার জন্য নয়।

এই অবস্থানের কারণে তিনি যেমন সমর্থন পেয়েছেন, তেমনি তীব্র সমালোচনারও মুখে পড়েছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে আক্রমণ করেছেন এবং ইসরায়েলের প্রতি তার অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। তবে এল সাইদ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তার নির্বাচনী এলাকার ইহুদি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা তিনি তার নিজের দুই মেয়ের নিরাপত্তার মতোই নিশ্চিত করতে চান।

মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক প্রাথমিক নির্বাচনে এল সাইদের বিজয়ের পেছনে ইসরায়েল ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হেইলি স্টিভেন্স ইসরায়েলপন্থী অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন এবং তার প্রচারণায় ইসরায়েলপন্থী সংগঠনগুলোর সমর্থন ছিল। বিপরীতে এল সাইদ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করেন।

মিশিগানে ডেমোক্র্যাট দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় অংশের সমর্থন না পেলেও এল সাইদ মনোনয়ন জিতে নিয়েছেন। এ কারণে তাকে দলের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থাকা একজন ‘বহিরাগত’ রাজনীতিক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বামপন্থী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা বার্নি স্যান্ডার্স ও আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজসহ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

৪১ বছর বয়সী এল সাইদের মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় পদচারণা শুরু হয় ২০১৮ সালের মিশিগান গভর্নর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। সে নির্বাচনে তিনি পরাজিত হলেও ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। তখনও তার প্রচারণার প্রধান বিষয় ছিল স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে কর্পোরেট অর্থের প্রভাব কমানো।

এর আগে জনস্বাস্থ্য খাতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এল সাইদ। ২০১৫ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি ডেট্রয়েটের জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হন। বড় কোনো মার্কিন শহরের জনস্বাস্থ্য বিভাগের এমন পদে দায়িত্ব নেওয়া সবচেয়ে কম বয়সী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন তিনি। দায়িত্ব পালনকালে শিশু মৃত্যুহার কমানো, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে চশমা দেওয়া এবং শতাধিক স্কুলে সীসার উপস্থিতি পরীক্ষা করার মতো উদ্যোগ নেন।

রাজনীতিতে তার আগ্রহ তৈরির পেছনে ২০০৭ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। ২০১৭ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেওয়ার পর তিনি ডেট্রয়েটের জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

এবার নভেম্বরে তাকে লড়তে হবে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে। রজার্সকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে দেখা হয়। ফলে মিশিগানের এই নির্বাচন শুধু একজন সিনেটর নির্বাচনের লড়াই নয়, বরং ট্রাম্পের রাজনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও হয়ে উঠতে পারে।

এল সাইদ নিজেও তার প্রচারণায় এই লড়াইকে ট্রাম্পবাদবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, মাইক রজার্স ও ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চান। স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।

মিশিগানে এল সাইদের জয় ডেমোক্র্যাটদের জন্য কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিশিগান ট্রাম্পের পক্ষে যাওয়ার পর অঙ্গরাজ্যটি আবার ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে ফিরলে তা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

একই সঙ্গে এল সাইদ সিনেট নির্বাচনে জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে তা ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনবে। তার বিজয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে—বিশেষ করে দলটি মধ্যপন্থী রাজনীতির পরিবর্তে আরও বামঘেঁষা প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকবে কি না, সে প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।

তবে ইতিহাস গড়ার পথে এল সাইদের সামনে এখনো কঠিন লড়াই। নভেম্বরে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারাতে পারলেই কেবল তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার গৌরব অর্জন করবেন। সেই ফল শুধু মিশিগানের রাজনীতিই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতেও মুসলিম ও বামঘেঁষা রাজনীতির ভবিষ্যৎ প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

ক্যানসারে আক্রান্ত বাইডেন

ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্রভান্ডারের বিস্তারিত জানতে মার্কিন কংগ্রেসে বিরল উদ্যোগ

বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীর বাড়ির সামনে বিক্ষোভ