TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ইংলিশ চ্যানেল হয়ে আসা অভিবাসীদের জন্য লাখো সামগ্রী বিতরণঃ প্রশ্নের মুখে ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা

যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে অবস্থানরত অভিবাসীদের মধ্যে ১ লাখ ৬২ হাজারের বেশি বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ করেছে ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা ‘কেয়ার ফোর কালে’। সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করেছে ডেইলি এক্সপ্রেস। এসব সহায়তার মধ্যে বিনামূল্যের মোবাইল সিম, পোশাক, খাবার, শীতবস্ত্রসহ নানা ধরনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থাটির স্বেচ্ছাসেবকেরা ২ হাজার ২২১টি ভোডাফোন মোবাইল সিম কার্ড বিতরণ করেছেন। এসব সিমে ছয় মাসের তথ্যসেবা আগে থেকেই যুক্ত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩ হাজার ৭৬৫টি হুডি, ৩ হাজার ৫৩২ জোড়া ট্র্যাকস্যুটের প্যান্ট এবং ১ হাজার ১৭৪টি টি-শার্টও দেওয়া হয়েছে।

শুধু পোশাক ও যোগাযোগের সুবিধাই নয়, অভিবাসীদের জন্য খাদ্যসামগ্রীও বিতরণ করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে কালে এলাকায় ১ হাজার ১৭৩টি রমজান খাদ্য প্যাকেট দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২ হাজার ৭৭০টি শীতকালীন প্যাকেটে টুপি, গলা ঢাকার কাপড় ও হাতমোজা এবং ১ হাজার ১৬৯টি আবহাওয়ারোধী পোশাক বিতরণ করা হয়েছে।

ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে আশ্রয়প্রার্থীদের অবস্থানের সময়ও সংস্থাটি বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ৮০টি সহায়তা কার্যক্রম এবং ১৭টি বড় পরিসরের বিতরণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২৩ হাজার বিনামূল্যের সামগ্রী দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

‘কেয়ার ফোর কালে’ অভিবাসীদের আরও বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যে চুল কাটার ব্যবস্থা, মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার সুযোগ, ইংরেজি ভাষার শিক্ষা এবং সাইকেল ও সেলাই মেরামত। যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ উপকূলে নতুন করে আসা প্রায় ১ হাজার ৮০০ অভিবাসীর জন্য স্বাগত প্যাকেটও বিতরণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তবে এই কর্মকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাবেক স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড গোয়েন্দা কর্মকর্তা পিটার ব্লেকসলি অভিযোগ করেছেন, অভিবাসীদের ফ্রান্স থেকে যুক্তরাজ্যে আসার পুরো প্রক্রিয়ায় বিভিন্নভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। তার মতে, এ ধরনের সহায়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়াতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে নরফোকের থেটফোর্ডে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভের প্রসঙ্গও টেনে আনেন ব্লেকসলি। তার বক্তব্য, অভিবাসন ইস্যুতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও উত্তেজনা বাড়ছে।

সাবেক সশস্ত্র বাহিনী প্রতিমন্ত্রী বিল র‌্যামেলও সংস্থাটির কার্যক্রমের সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, দাতব্য সংস্থাটির কর্মীরা হয়তো মানবিক উদ্দেশ্যেই কাজ করছেন, কিন্তু কালে এলাকায় অভিবাসীদের সহায়তা করার ফলে যুক্তরাজ্যে আসার প্রবণতা উৎসাহিত হতে পারে।

র‌্যামেলের মতে, কোনো ব্যক্তির আশ্রয়ের আবেদন বৈধ কি না, সেটি আলাদা বিষয়। কিন্তু ফ্রান্সে অবস্থানরত অভিবাসীদের নিয়মিত সহায়তা দেওয়া হলে তাদের যুক্তরাজ্যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হতে পারে। তিনি এটিকে জনসমর্থনের দিক থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে দাতব্য সংস্থাটি নিজেদের কর্মকাণ্ডকে মানবিক সহায়তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। সংস্থাটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সিডনি সোফার বলেছেন, উত্তর ফ্রান্সে অত্যন্ত দুর্বিষহ পরিবেশে বসবাসকারী শরণার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।

তার দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে সহায়তা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা আগের বছরগুলোর তুলনায় খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি। তবে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ এবং ফরাসি কর্তৃপক্ষের নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের কারণে সেখানে বসবাসরত শরণার্থীদের প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

সোফারের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্ছেদ অভিযানের কারণে অনেক শরণার্থী আশ্রয়, ব্যক্তিগত সামগ্রী ও মৌলিক নিরাপত্তা হারাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে তাদের মানবিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন বলেই সংস্থাটি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে আসা অভিবাসীদের সংখ্যা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। এমন সময়ে একটি দাতব্য সংস্থার পক্ষ থেকে বিপুল পরিমাণ সহায়তা বিতরণের তথ্য প্রকাশ হওয়ায় অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।

সমালোচকদের একাংশ মনে করছেন, সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার আগে অভিবাসীদের খাদ্য, পোশাক ও যোগাযোগের সুবিধা দেওয়া হলে তা পরোক্ষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাকে উৎসাহিত করতে পারে। অন্যদিকে, দাতব্য সংস্থাটির অবস্থান হলো—তারা কাউকে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে প্রবেশে উৎসাহিত করছে না; বরং কঠিন ও মানবেতর পরিস্থিতিতে থাকা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে মানবিক সহায়তা দিচ্ছে।

ফলে একদিকে চ্যানেল পাড়ি ঠেকাতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ, অন্যদিকে ফ্রান্সে অবস্থানরত অভিবাসীদের জন্য মানবিক সহায়তা—এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, তা নিয়ে যুক্তরাজ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য এক্সপ্রেস

এম.কে

আরো পড়ুন

বিমানবন্দরে মানবাধিকার কর্মীকে আটকের কারণে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিবের ক্ষমাপ্রার্থনা

যুক্তরাজ্যে চ্যানেল পাড়ি দেওয়া অভিবাসীরা ২৪ গুণ বেশি অপরাধে জড়িতঃ কনজারভেটিভ পার্টি গবেষণা

যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর অগ্রগতি ক্ষীণ