TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ইউরোপের ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্রঃ বেআইনি অভিবাসন ফেরানো সহজ করবে ব্রিটেন-ইউরোপ

অভিবাসন ও মানবপাচারের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়ে ইউরোপের ৪৬টি দেশ একটি ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। যুক্তরাজ্যসহ কাউন্সিল অব ইউরোপের সব সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থনে গৃহীত এই সিদ্ধান্ত স্ট্রাসবার্গের ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতকে (ইসিএইচআর) অভিবাসন সংক্রান্ত অধিকাংশ মামলায় হস্তক্ষেপ কমাতে ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় আদালতের সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানিয়েছে।

মলডোভার রাজধানী কিশিনেউতে শুক্রবার অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে এই ঘোষণাপত্র উন্মোচিত করা হয়। এতে সতর্ক করে বলা হয়, মানবপাচারকারী চক্র ও প্রতিকূল রাষ্ট্রগুলোর কারসাজি ইউরোপীয় গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল করে দিতে পারে, যদি দেশগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে অভিবাসীদের সরিয়ে নিতে না পারে। নথিতে রাষ্ট্রের ‘অস্বীকার্য সার্বভৌম অধিকার’ পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে—যার ভিত্তিতে প্রতিটি দেশ জনস্বার্থে নিজস্ব অভিবাসন নীতি নির্ধারণ ও বিদেশি নাগরিকদের বহিষ্কার করতে পারবে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়ভেট কুপার বৈঠকের পূর্বে এক ভাষণে এই চুক্তিকে ‘যুক্তিসংগত দৃষ্টিভঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে অভিবাসন ব্যবস্থা অন্যায়ভাবে কাজে লাগানো না যায়।” তবে ঘোষণাপত্রটি মানবাধিকার আইনের পুনর্লিখন নয়—যার জন্য অনেক বছর লেগে যেত—বরং এটি আদালতের বিচারকদের কাছে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা, যা জনস্বার্থ ও গণতন্ত্রের বিষয়টিকে অভিবাসন মামলায় গুরুত্ব দিতে নির্দেশ দেয়।

এদিকে সমালোচকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এই সিদ্ধান্তে মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল হবে এবং বিচারকরা চাইলে এটাকে উপেক্ষাও করতে পারেন। তবে ব্রিটেন ও অন্যান্য দেশ মনে করছে, এই ঘোষণা ভবিষ্যতে বহিষ্কার প্রক্রিয়ায় আইনি বাধা খারিজ করার পথ সুগম করবে।

ঘোষণাপত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, মানবপাচার বা শত্রু রাষ্ট্রের সংগঠিত পদক্ষেপ “কনভেনশন ব্যবস্থার অখণ্ডতা ও তার প্রতি সমর্থনকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করে।” তাই ইউরোপের বাইরে তথাকথিত ‘প্রত্যর্পণ হাব’ (রিটার্ন হাব) তৈরি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রত্যাখ্যাত অভিবাসীদের রাখা যেতে পারে। ইতালি ইতোমধ্যে আলবেনিয়ার সঙ্গে এমন একটি চুক্তি বাস্তবায়ন করছে এবং যুক্তরাজ্যও অনুরূপ উদ্যোগের কথা ভাবছে, যদিও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত ফল আসেনি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ‘ধারা ৩’-এর ব্যাখ্যায়। যদিও নির্যাতনের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে, ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে যে কোনো ব্যর্থ অভিবাসী শুধু এই অজুহাতে বহিষ্কার এড়াতে পারবে না যে তার নিজ দেশের হাসপাতাল বা সামাজিক পরিষেবা ইউরোপের মানের চেয়ে নিচু। বলা হয়েছে, প্রাপ্তিকারক দেশে স্বাস্থ্যসেবার গুণমান শুধুমাত্র ‘অত্যন্ত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে’ অমানবিক আচরণের ঝুঁকি তৈরি করবে।

নতুন দলিলটি দীর্ঘদিনের নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে পারিবারিক জীবনের অধিকার কারও বহিষ্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এই ভারসাম্য নির্ধারণের মূল দায়িত্ব জাতীয় আদালতের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে, স্ট্রাসবার্গের নয়।

এক বিবৃতিতে বলা হয়, “ব্যক্তির অধিকার ও স্বার্থ এবং স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। সেই ভারসাম্য নির্ধারণের প্রাথমিক দায়িত্ব জাতীয় কর্তৃপক্ষের।”

এই ঘোষণাপত্র কার্যকরভাবে অভিবাসন নীতি ও মানবাধিকার রক্ষার মধ্যে নতুন একটি সীমারেখা টেনে দিয়েছে—যার সফলতা এখন নির্ভর করবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় আদালত ও স্ট্রাসবার্গ আদালতের ভবিষ্যৎ মামলার রায়ের ওপর।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

কোরআন পোড়ানো ভ্যালেন্টিনার যুক্তরাজ্যে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাজ্যে স্মেথউইকের দম্পতি গ্রেপ্তারঃ ১৪ নারীকে শোষণ, ব্রোথেল ও মানবপাচারের দায়ে কারাদণ্ড

ব্রিটেনকে ঋণমুক্ত করতে পেনশন কাটছাঁট অবশ্যম্ভাবী, কষ্ট স্বীকার করতে হবে সরকারকে