15.1 C
London
June 9, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

৭ পেনির সবজির আড়ালে শ্রমিক শোষণঃ ব্রিটিশ সুপারমার্কেটগুলোর বিরুদ্ধে নতুন বিতর্ক

যুক্তরাজ্যের সুপারমার্কেটগুলোতে মাত্র ৭ পেনি বা তারও কম দামে বিক্রি হওয়া সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কি অভিযোগ করেছেন, এই অস্বাভাবিক কম দামের পেছনে লুকিয়ে আছে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের ওপর ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপ এবং শোষণের এক অদৃশ্য চক্র।

পোলানস্কির ভাষায়, “ভোক্তাদের আকৃষ্ট করতে সুপারমার্কেটগুলো যখন অবাস্তবভাবে কম দামে পণ্য বিক্রি করছে, তখন এর প্রকৃত মূল্য পরিশোধ করছেন উৎপাদক ও শ্রমিকরা।” তিনি দাবি করেন, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে ন্যায্য মজুরি ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর আইন প্রয়োজন।

ব্রিটেনে বড় বড় সুপারমার্কেটগুলো দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে ‘প্রাইস ওয়ার’ বা মূল্যযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। আলু, গাজর, বাঁধাকপি কিংবা অন্যান্য মৌসুমি সবজি প্রায়ই অত্যন্ত কম দামে বিক্রি করা হয়। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে কিছু সুপারমার্কেট ক্ষতি স্বীকার করেও নির্দিষ্ট পণ্য কম মূল্যে বিক্রি করে থাকে, যা ব্যবসায়িক কৌশল হিসেবে পরিচিত ‘লস লিডার’ নামে।

সমালোচকদের মতে, এই মূল্যযুদ্ধের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে কৃষকদের ওপর। কারণ সুপারমার্কেটগুলো সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কম দামে পণ্য কিনতে বাধ্য করে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও অনেক কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না।

যুক্তরাজ্যের কৃষকদের সংগঠন ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের পূর্ববর্তী একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জ্বালানি, সার, শ্রমিক ব্যয় এবং পরিবহন খরচ বাড়লেও কৃষিপণ্যের ক্রয়মূল্য সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে অনেক ছোট ও মাঝারি কৃষি খামার টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে।

জ্যাক পোলানস্কি প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালায় কৃষি ও খাদ্য খাতের শ্রমিকদের জন্য প্রতি ঘণ্টায় ন্যূনতম ১৫ পাউন্ড মজুরি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেতনের ওপর সীমা আরোপের বিষয়টিও আলোচনায় এনেছেন তিনি। তার মতে, “একদিকে যখন খাদ্যশ্রমিকরা জীবনধারণের জন্য লড়াই করছেন, অন্যদিকে শীর্ষ নির্বাহীরা কোটি কোটি পাউন্ড আয় করছেন—এই বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়।”

তবে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে ব্রিটিশ রিটেল কনসোর্টিয়াম। সংগঠনটির দাবি, অতিরিক্ত কর, বেতন বৃদ্ধি এবং কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ খাদ্যখাতের পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে সুপারমার্কেটগুলো বাধ্য হবে পণ্যের দাম বাড়াতে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।

বিরোধী দলগুলোর কিছু নেতাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা ব্রিটিশ পরিবারগুলোর জন্য সাশ্রয়ী দামে খাদ্য নিশ্চিত করাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই যেকোনো নীতিগত পরিবর্তন আনার আগে এর অর্থনৈতিক প্রভাব গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। খাদ্যব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে একদিকে যেমন সস্তা খাবার ভোক্তাদের জন্য স্বস্তি এনে দেয়, অন্যদিকে সেই সস্তা খাবারের প্রকৃত মূল্য কে দিচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শ্রম অধিকারকর্মীরা।

শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কৃষিখাতে মৌসুমি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ বিদেশি কর্মী হওয়ায় তারা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল অবস্থানে থাকেন। কাজের পরিবেশ, বাসস্থান এবং মজুরি নিয়ে অতীতে বিভিন্ন অভিযোগও সামনে এসেছে। যদিও সুপারমার্কেটগুলো দাবি করে, তারা সরবরাহ চেইনে নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় নির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে চলে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিতর্ক শুধু সস্তা সবজি বা সুপারমার্কেটের মুনাফা নিয়ে নয়; বরং এটি খাদ্য ব্যবস্থার ন্যায্যতা, শ্রমের মূল্য এবং করপোরেট দায়বদ্ধতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই সমাধান খুঁজে পেতে কৃষক, শ্রমিক, খুচরা বিক্রেতা এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বিত আলোচনার বিকল্প নেই। কারণ খাদ্য ব্যবস্থার প্রতিটি স্তর পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, আর এর ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই বহন করতে হয়।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রতি আস্থা তলানিতে, চাপে স্টারমার প্রশাসন

ইসরায়েলে কিছু অস্ত্র রপ্তানি স্থগিত করছে যুক্তরাজ্য, জানালেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধে যুক্তরাজ্যের ৬০ এমপি ও লর্ডের একযোগে চিঠি