মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রায় এক মাস পার হলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার মুখেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো অটুট রয়েছে—যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। এরপর একে একে দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের আরও বেশ কয়েকজন নেতা নিহত হওয়ার খবর আসে। একইসঙ্গে, বিভিন্ন শহর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।
তবে এসব আঘাত সত্ত্বেও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি। বরং দেশটির শাসনব্যবস্থা এখনো কার্যকর রয়েছে, যা অনেক বিশ্লেষকের কাছে অপ্রত্যাশিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো ইরানের জটিল ও বহুমাত্রিক ক্ষমতার কাঠামো। সর্বোচ্চ নেতার পাশাপাশি দেশটিতে কার্যকর রয়েছে একটি শক্তিশালী ‘সমান্তরাল রাষ্ট্র’ ব্যবস্থা, যার কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর বা আইআরজিসি।
আইআরজিসি কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়; এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। চলমান সংঘাতে তাদের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কমান্ডার নিহত হলেও, সংস্থাটি দাবি করে—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য বিকল্প নেতৃত্ব আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়।
এছাড়া আইআরজিসির অধীনস্থ আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’ এখনও সক্রিয় রয়েছে। প্রায় ১০ লাখ সদস্যের এই স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া বাহিনী বিভিন্ন শহরে তল্লাশি ও নিরাপত্তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধের আগে যে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা এখন অনেকটাই স্তিমিত। নিরাপত্তা উদ্বেগ, কঠোর নজরদারি, ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনের কড়া অবস্থানের কারণে জনগণের মধ্যে সংগঠিত আন্দোলন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকার দীর্ঘ সময় এবং গণ-বার্তার মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠানোসহ নানা পদক্ষেপের ফলে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যোগাযোগও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে, যুদ্ধের মধ্যে বড় ধরনের কোনো সরকারবিরোধী আন্দোলন আর দেখা যায়নি।
এদিকে, খামেনির মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে তিনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি, যা তার অবস্থান ও স্বাস্থ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ধারাবাহিক হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং তাদের কমান্ড কাঠামো প্রায় পঙ্গু হয়ে গেছে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত শেষ হওয়ার পরিবর্তে আরও জটিল ও তীব্র হয়ে উঠছে। এরই মধ্যে ইরান থেকে প্রায় ৩,৮০০ কিলোমিটার দূরের দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে, যদিও তা লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শীর্ষ নেতৃত্বে এত ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো কার নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে? এবং কীভাবে এত চাপের মধ্যেও দেশটি তার কার্যকর সক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ‘বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষমতা কাঠামো’, আইআরজিসির স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি উপাদানই এখন পর্যন্ত দেশটির শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
এম.কে

