TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

ইরান অস্থিতিশীল করতে গোপন অভিযান ও হামলার বিকল্প বিবেচনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানে চলমান নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও ব্যাপক প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে। মার্কিন সরকারি কর্মকর্তারা ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করেছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং হামলার আগে সামরিক সরঞ্জাম সরানোর মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

 

সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলে তেহরানকে অস্থিতিশীল করতে গোপন সিআইএ অভিযান অনুমোদন দিতে পারেন অথবা ইসরায়েলকে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরাসরি হামলার অনুমতি দিতে পারেন। এই সম্ভাবনাগুলো ওয়াশিংটনে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে, যদিও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়নি।

শনিবার ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরান “স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে” এবং যুক্তরাষ্ট্র “সহায়তা দিতে প্রস্তুত”। তার এই মন্তব্য মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পুনরায় শেয়ার করলে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর একদিন আগেই ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান “বড় বিপদে” রয়েছে এবং তিনি সামরিক হামলার নির্দেশ দিতে পারেন—এমন ইঙ্গিতও দেন।

এই উত্তেজনার মধ্যেই শনিবার সন্ধ্যায় জার্মানি থেকে দুটি মার্কিন C-17A সামরিক পরিবহন বিমান মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা করে, যা সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে জল্পনা বাড়িয়ে দেয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এসব উড্ডয়নকে হামলার প্রস্তুতি হিসেবে স্বীকার করেনি।

অন্যদিকে, ইরানে শাসকগোষ্ঠীর কঠোর দমন-পীড়নের মধ্যেও বিক্ষোভ থামেনি। শনিবার রাতে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে টানা ১৪তম দিনের মতো হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামে। বিক্ষোভকারীরা “স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক” এবং “মোল্লারা মরার আগ পর্যন্ত দেশ মুক্ত হবে না”—এমন স্লোগান দেয়। ঘরে থাকার নির্দেশ অমান্য করে তারা রাস্তায় নামায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের গুলিতে হতাহতের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

চিকিৎসকদের তথ্যমতে, দেশজুড়ে হাসপাতালগুলো গুলিবিদ্ধ আহতদের ভিড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সরকারিভাবে নিশ্চিত ৫১ জন নিহতের সংখ্যা প্রকৃত মৃত্যুর তুলনায় অনেক কম বলে তারা মনে করছেন।

বহু পরিবার ভয় ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে মৃত্যুর খবর জানাতে পারছে না। আহত বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তারের জন্য হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। রক্তের তীব্র সংকটের কারণে অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু একটি হাসপাতালেই এক রাতে ৭০টি মরদেহ আনা হয়। অযাচাইকৃত হিসাবে নিহতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বিক্ষোভকারীদের চোখ লক্ষ্য করে গুলি করছে—যা ২০২২ সালের “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” আন্দোলনের সময়ও দেখা গিয়েছিল। তবুও ভয় উপেক্ষা করে মানুষ রাস্তায় নামছে, মহাসড়কে আগুন জ্বালাচ্ছে এবং সরকারবিরোধী স্লোগানে শহরের বিভিন্ন এলাকা মুখর করে তুলছে।

এই আন্দোলনে অনেক তরুণ ও সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন। ১৭ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্র উত্তর ইরানে গুলিতে প্রাণ হারায়, অন্যদিকে দেশের ভিন্ন প্রান্তে দুই সন্তানের এক মা নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। এসব ঘটনা বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র রেজা পাহলভি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে আন্দোলনকে আরও সংগঠিত ও লক্ষ্যভিত্তিক করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, কেবল রাস্তায় নামাই নয়, বরং শহরের কেন্দ্রগুলো দখল ও ধরে রাখার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এসেছে।

এদিকে ইরানের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই অস্থিরতার পেছনে দায়ী করেছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, বিদেশি ষড়যন্ত্র ও বিরোধী গোষ্ঠীর সহায়তায় দেশের নিরাপত্তা নষ্ট করার চেষ্টা চলছে। সেনাবাহিনী ঘোষণা দিয়েছে, সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশে তারা কৌশলগত স্থাপনা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী শিরিন এবাদি সতর্ক করে বলেছেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী বড় ধরনের সহিংসতা চালাতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ইরানের ভেতরে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে আরও অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

নেতানিয়াহুকে গ্রেফতারের আহ্বান মার্কিন কংগ্রেস ওম্যানের

ইতিহাস সৃষ্টি করে সিরিয়ান শরনার্থী হলেন জার্মানির মেয়র

তিন দেশে সরকার পতনঃ ‘নীরব’ চীনের ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ