ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ কোনো বড় হামলা হলে এবার ইরান একা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একই সময়ে সক্রিয় করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে—এমন দাবি উঠেছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা মূল্যায়নে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান হিজবুল্লাহ, হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরানপন্থী ইরাকি মিলিশিয়াগুলোকে সমন্বিত করে ইসরায়েলের ওপর বহু-মুখী হামলার সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
ইসরায়েলি মূল্যায়ন অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো হামলা শুরু হলে একাধিক ফ্রন্টকে একই সময়ে সক্রিয় করা। অর্থাৎ লেবানন, গাজা, ইয়েমেন ও ইরাকের দিক থেকে চাপ তৈরির পাশাপাশি ইরান নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। এর ফলে ইসরায়েলকে একই সময়ে একাধিক যুদ্ধক্ষেত্র সামলাতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই সম্ভাব্য আঞ্চলিক সমন্বয়ের কেন্দ্রে রয়েছে ইরান। ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে তেহরানকে হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথি এবং ইরাকের বিভিন্ন শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠীকে নিয়ে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান বিভিন্ন দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
সম্ভাব্য পরিকল্পনায় লেবাননের হিজবুল্লাহকে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর ফ্রন্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইসরায়েলি মূল্যায়নে হিজবুল্লাহ ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি বিমান হামলায় দক্ষিণ লেবাননে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে, যা পরিস্থিতির উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
গাজা থেকে হামাসও সম্ভাব্য দক্ষিণ ফ্রন্টের অংশ হতে পারে বলে ইসরায়েলি মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। আগস্টে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছিল, ইরানের সহায়তায় হামাস ও হিজবুল্লাহ নিজেদের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এই সমন্বয়কে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আঞ্চলিক ‘অক্ষ’ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
ইয়েমেনের হুথিরাও সম্ভাব্য পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। লোহিত সাগর ও ইয়েমেনের দিক থেকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন কিংবা সামুদ্রিক হামলার মাধ্যমে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও হুথিদের ইরানের দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ইরাকের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও এই সম্ভাব্য সমন্বিত কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানপন্থী ইরাকি মিলিশিয়াগুলোর সঙ্গে হুথিদের সমন্বয়ের নজির পাওয়া গেছে। জুলাইয়ে ইরাকের ভেতর থেকে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার ক্ষেত্রেও হুথি ও ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কথা আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত হয়েছিল।
এই নতুন কৌশলের সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার তুলনাও করা হচ্ছে। সেদিন হামাস ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আকস্মিক বড় হামলা চালালেও ইরানপন্থী অন্যান্য গোষ্ঠী একই সময়ে পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধে প্রবেশ করেনি। নতুন ইসরায়েলি মূল্যায়নের দাবি হলো, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে তেহরান আগে থেকেই বিভিন্ন সহযোগী গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে একাধিক কৌশলগত বৈঠক করেছে এবং যৌথ প্রশিক্ষণ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে ইসরায়েলি মূল্যায়নে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে নেই। বরং বর্তমানে যে তথ্যগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো মূলত ইসরায়েলি গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং সেসব মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন। তাই সম্ভাব্য সমন্বিত হামলার বিষয়টিকে নিশ্চিত সামরিক পরিকল্পনা হিসেবে নয়, বরং ইসরায়েলের একটি গুরুতর নিরাপত্তা-আশঙ্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ইরানও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের বড় ধরনের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। তেহরানের এই অবস্থান ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে সংঘাতের বিস্তারের ঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সূত্রঃ জেরুজালেম পোস্ট
এম.কে

