লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম তাদের কিছু সংগ্রহের লেবেল থেকে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দটি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। ইসরায়েলপন্থী আন্দোলনকর্মীদের চাপের প্রেক্ষাপটে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক বিষয়টিকে ইতিহাসের রাজনৈতিক পুনর্লিখনের অংশ হিসেবে দেখছেন।
অভিযোগ উঠেছে, ইউকেএলএফআই নামের একটি সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কাছে আপত্তি জানায়। তারা ‘প্রাচীন প্যালেস্টাইন’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের বিরোধিতা করে। একই ধরনের দাবি এর আগে যুক্তরাজ্যের ওপেন ইউনিভার্সিটির কাছেও উত্থাপিত হয়েছিল বলে জানা গেছে।
সমালোচকদের মতে, ইউরোপের অধিকাংশ জাতীয় জাদুঘরের মতো ব্রিটিশ মিউজিয়ামও একটি ঐতিহাসিকভাবে ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানের অংশ। ১৭৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরের সংগ্রহ ও বিস্তার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে সংগৃহীত নিদর্শন ও ঐতিহাসিক বস্তু নিয়ে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই ‘ঐতিহাসিক মালিকানা’ প্রশ্নে বিতর্কের মুখে রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক কেবল একটি পরিভাষাগত পরিবর্তন নয়; বরং এর সঙ্গে অঞ্চলটির ঐতিহাসিক পরিচয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহু সংস্থা ও গবেষক ইসরায়েলকে একটি ঔপনিবেশিক প্রকল্পের ধারাবাহিকতা হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের মতে, ইতিহাসের ভাষা ও পরিভাষা পরিবর্তনের মাধ্যমে অতীতের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে।
ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে অনেকে বলছেন, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো অতীতে নিজেদের দখলদারত্বকে বৈধতা দিতে ইতিহাস পুনর্লিখনের আশ্রয় নিয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী সিসিল রোডস জিম্বাবুয়ের প্রাচীন নগরী গ্রেট জিম্বাবুয়ের ইতিহাস ব্যাখ্যায় ইউরোপীয় উৎস খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন—যা পরবর্তীতে ঐতিহাসিকভাবে ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়।
একইভাবে, ১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন বেনোপার্ট মিসর ও সিরিয়া হয়ে ফিলিস্তিনে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, সামরিক অভিযানের পাশাপাশি তিনি শিক্ষাবিদদেরও সঙ্গে নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও জাদুঘর সংস্কৃতির বিকাশে প্রভাব ফেলে। গবেষকদের মতে, জাদুঘর ও প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রহের ইতিহাস ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বিস্তারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
সমালোচকরা আরও বলছেন, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর অঞ্চলটির ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। ‘প্রাচীন প্যালেস্টাইন’ শব্দবন্ধ মুছে ফেলার উদ্যোগকে তারা ইতিহাসের ভাষাগত পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে দেখছেন।
সম্প্রতি ‘ডিকলোনাইজ দ্য কারিকুলাম’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা বহু জাদুঘর ও বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের ঔপনিবেশিক অতীত পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছিল। তবে এখন একই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ায় সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে শব্দ ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি আরও বিতর্ক উসকে দিয়েছে। ইতিহাসবিদদের একটি অংশ বলছেন, গ্যালারির লেবেল বা শিক্ষাসামগ্রী থেকে ‘প্রাচীন প্যালেস্টাইন’ শব্দটি সরানো ঐতিহাসিক নির্ভুলতার প্রশ্ন নয়; বরং এটি রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার প্রতিফলন।
সাংস্কৃতিক ও একাডেমিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—ইতিহাসের ভাষা নির্ধারণ করবে কে? জাদুঘর কি কেবল অতীতের নিদর্শন সংরক্ষণ করবে, নাকি সমসাময়িক রাজনৈতিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের বয়ান পরিবর্তন করবে? ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
সূত্রঃ মিডল ইস্ট আই
এম.কে

