উত্তর সাগরের বিতর্কিত জ্যাকড গ্যাসক্ষেত্র ও রোজব্যাংক তেলক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের যুক্তি, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, তাপপ্রবাহ ও দাবানলের বাস্তবতা—এই দুই বিপরীত চাপের মধ্যে সরকার আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বার্নহ্যাম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম বড় নীতিগত পরীক্ষাগুলোর একটি হিসেবে এই সিদ্ধান্তকে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে তিনি প্রতিরক্ষা ব্যয়, কল্যাণ সংস্কার, থেমস ওয়াটারের ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক পরিচর্যা সংস্কারের মতো একাধিক কঠিন ইস্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর সাগরের তেল-গ্যাস প্রকল্প নিয়ে সিদ্ধান্তই তার নেতৃত্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে জ্যাকড ও রোজব্যাংক প্রকল্প। কনজারভেটিভ সরকারের সময় এগুলো অনুমোদন পেলেও ২০২৫ সালে আদালত রায় দেয়, প্রকল্পগুলোর পরিবেশগত মূল্যায়নে পোড়ানো জ্বালানির পূর্ণ কার্বন নিঃসরণ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। সেই কারণে নতুন করে পরিবেশগত মূল্যায়ন ও জনপরামর্শের পর এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের ওপর পড়েছে।
সরকারের ভেতর থেকেও ইঙ্গিত মিলেছে যে বার্নহ্যাম উত্তর সাগর ইস্যুতে “বাস্তববাদী” অবস্থান নিতে পারেন। এই অবস্থান জ্বালানি খাতের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। শিল্প প্রতিনিধিদের দাবি, দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বন্ধ রেখে বিদেশ থেকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত গ্যাস আমদানি করা যুক্তরাজ্যের জন্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ক্ষতিকর। তাদের মতে, দেশীয় উৎপাদন কর্মসংস্থান, কর রাজস্ব এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে পরিবেশবাদী সংগঠন, জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং গ্রিন পার্টির নেতারা এই প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নিয়েছেন। তাদের দাবি, নতুন তেল-গ্যাস প্রকল্প অনুমোদন দিলে যুক্তরাজ্যের নেট-জিরো লক্ষ্য দুর্বল হবে এবং সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানলের মতো জলবায়ু সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
চাপ আরও বেড়েছে সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকেও। দুই শতাধিক সংগীতশিল্পী—যাদের মধ্যে ম্যাসিভ অ্যাটাক, ব্রায়ান ইনো, রবার্ট স্মিথ ও অলি আলেকজান্ডারের মতো পরিচিত নাম রয়েছে—প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠিতে রোজব্যাংক ও জ্যাকড প্রকল্প বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, এসব প্রকল্প যুক্তরাজ্যের জ্বালানি বিল কমাবে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বাড়াবে।
এদিকে জ্যাকড প্রকল্পের জনপরামর্শ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং রোজব্যাংকের পরামর্শও সমাপ্তির পথে। ফলে আগামী মাসেই সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বার্নহ্যাম যদি প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেন, তাহলে লেবার পার্টির পরিবেশবাদী অংশ ও গ্রিন সমর্থকদের ক্ষোভের মুখে পড়বেন। আবার অনুমোদন না দিলে জ্বালানি শিল্প, উত্তর সাগর-নির্ভর অর্থনীতি এবং ডানপন্থী সমালোচকদের আক্রমণের মুখে পড়তে হবে। ফলে উত্তর সাগরের এই সিদ্ধান্ত শুধু জ্বালানি নীতিই নয়, বার্নহ্যামের নেতৃত্বের প্রথম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষাতেও পরিণত হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

