জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় নদীগুলোতে বন্যা ও খরার ঝুঁকি নতুন মাত্রা পেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, উষ্ণায়নের ফলে নদীগুলোতে শুষ্ক ও আর্দ্র অবস্থার মধ্যে দ্রুত ও ঘনঘন পরিবর্তন ঘটবে, যা বন্যা ও খরা মোকাবিলার প্রচলিত ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলতে পারে।
গবেষকরা এই ঘটনাকে ‘হাইড্রোক্লাইমেটিক হুইপল্যাশ’ বা আবহাওয়াগত জলচক্রের আকস্মিক দোলাচল হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর অর্থ হলো, কোনো অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ের শুষ্ক আবহাওয়ার পর হঠাৎ অতিবৃষ্টি কিংবা অতিবৃষ্টির পর দ্রুত খরার পরিস্থিতি তৈরি হওয়া।
বুধবার প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডল আরও বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক সময়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে নদী ও জলাধারগুলোতে পানির প্রবাহ দ্রুত ওঠানামা করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ খরার পর শক্ত ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া মাটিতে হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাত হলে পানি মাটির ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। পরিবর্তে তা দ্রুত ভূপৃষ্ঠ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে মাটির ক্ষয়, নদীতে দূষণ বৃদ্ধি এবং পানির গুণগত মানের অবনতি ঘটতে পারে।
অন্যদিকে অতিবৃষ্টির পর হঠাৎ শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হলে খরা মোকাবিলা আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ পূর্ববর্তী আর্দ্র পরিবেশ মানুষ ও প্রশাসনের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি সৃষ্টি করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পানি সংকট দেখা দিতে পারে।
গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পূর্বাভাস ও উন্নত জলবিদ্যাগত মডেল ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যের ৬৯৮টি নদী অববাহিকার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন। এতে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দুটি সম্ভাব্য চিত্র বিবেচনায় নেওয়া হয়।
ফলাফলে দেখা গেছে, উভয় পরিস্থিতিতেই শুষ্ক-থেকে-আর্দ্র এবং আর্দ্র-থেকে-শুষ্ক পরিবর্তনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। কিছু নদী অববাহিকায় যেখানে ১৯৮১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ৩০ বছরে গড়ে চারবার এমন ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে ৪ ডিগ্রি উষ্ণায়নের পরিস্থিতিতে তা বেড়ে নয়বার পর্যন্ত ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা যুক্তরাজ্যের প্রায় সব অঞ্চলেই দেখা যাবে। তবে দক্ষিণ ওয়েলস, উত্তর আয়ারল্যান্ড, উত্তর ও পশ্চিম ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের কিছু এলাকায় ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক ড. ই হি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দ্রুত শুষ্ক ও আর্দ্র আবহাওয়ার পালাবদল ইতোমধ্যেই বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন ঘটবে, যা পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, অবকাঠামো ও দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তার মতে, শুধু একটি বন্যা বা একটি খরার জন্য পরিকল্পনা করলেই চলবে না। বরং ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত চরম আবহাওয়াগত ঘটনাগুলোর জন্য সমন্বিত প্রস্তুতি নিতে হবে।
গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই নতুন বাস্তবতা মোকাবিলায় অঞ্চলভিত্তিক অভিযোজন পরিকল্পনা জরুরি। এর মধ্যে বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাজ্যের এই গবেষণা বিশ্বের অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অব্যাহত থাকলে নদীর প্রবাহ, বন্যা ও খরার প্রকৃতি আমূল বদলে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

