TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ নীতির ছায়াঃ হিথ্রোর আটককেন্দ্রে মানবাধিকার সংকটের অভিযোগ

মানসিক নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
বিতর্কিত ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ আশ্রয়প্রার্থী বিনিময় প্রকল্পের আওতায় ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতিতে আটক থাকা ৮০ জন আশ্রয়প্রার্থী যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তারা দাবি করেছেন, ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর থেকে হোম অফিসের আচরণে তারা ভয়, অপমান ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন। পরিস্থিতি তদন্তের জন্য তারা জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

 

আটক ব্যক্তিরা ‘হারমন্ডসওয়ার্থ ইমিগ্রেশন রিমুভাল সেন্টারের অবস্থা ও আচরণ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন তৈরি করে অভিযোগগুলো নথিভুক্ত করেছেন। লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত হারমন্ডসওয়ার্থ হলো যুক্তরাজ্যের দুটি প্রধান অভিবাসন আটককেন্দ্রের একটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর থেকেই তাদের ইচ্ছামতো আটক রাখা হয়েছে এবং ন্যায্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

সুদান, আফগানিস্তান ও ইরানের মতো যুদ্ধ ও সংঘাতপীড়িত দেশ থেকে আসা এসব আশ্রয়প্রার্থীর অভিযোগ, তাদের আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা অনুপস্থিত, এবং আচরণ ছিল অপমানজনক ও অবমাননাকর। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আশায়, কিন্তু বাস্তবে তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে যেন তারা অপরাধী।

প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়েছে সরকারের নতুন আইন, যার আওতায় ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে আসা ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন জব্দ করে তল্লাশি চালানো যাবে। মানবপাচার সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের নামে এমন কিছু কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যার শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। আশ্রয়প্রার্থীদের দাবি, এসব আইন তাদের আরও ভীত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।

লেবার সরকার মানবপাচার দমনে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নিলেও বাস্তবে ছোট নৌকায় আগমন কমেনি। সরকারি হিসাবে, ২০২৫ সালে ৪১ হাজারের বেশি মানুষ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছে, যা রেকর্ডের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা। একই সময়ে, জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন জানায়, যাত্রীর সংখ্যা বাড়লেও মৃত্যুর হার আগের বছরের তুলনায় কম ছিল।

‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ প্রকল্পের আওতায় ২০২৬ সালের প্রথম ফ্রান্সগামী প্রত্যাবর্তন ফ্লাইট বুধবার নির্ধারিত। হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম তিন মাসে ১৯৩ জনকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং বিনিময়ে ১৯৫ জনকে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আনা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা একটি দিনে চ্যানেল পার হওয়া মোট আশ্রয়প্রার্থীর তুলনায় খুবই নগণ্য।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের অনেকেই ভয়াবহ যাত্রা ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর বিশ্রাম কিংবা মানসিক পুনর্বাসনের সুযোগ পাননি। অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই। শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসা না পাওয়ার পাশাপাশি আটক অবস্থার মানসিক চাপ তাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আটক আশ্রয়প্রার্থীদের একটি বড় অংশের বয়স ১৭ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে হতাশা, উদ্বেগ, অনিদ্রা ও মানসিক ভেঙে পড়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। একাধিক ক্ষেত্রে গুরুতর মানসিক সংকট ও আত্মক্ষতির চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি করা হয়, যার পর কিছু ব্যক্তিকে একাকী বা শাস্তিমূলক ইউনিটে রাখা হয়েছে।

আশ্রয়প্রার্থীদের দাবি, যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা মানবাধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার মৌলিক নীতির পরিপন্থী। প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না—তারা চান ন্যায়বিচার, মানবিক আচরণ এবং মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যুক্তরাজ্যের হোম অফিস এবং জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, তবে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল যুক্তরাজ্য,কানাডা ও অষ্ট্রেলিয়া

বিলেতে বাড়ি কেনাবেচাঃ লিমিটেড এডিশন মর্গেজ প্রোডাক্ট

‘ব্রেক্সিটে আমরা হেরেছি’—নাইজেল ফারাজের হতাশা প্রকাশ