যুক্তরাজ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিবারের ওপর বাড়তে থাকা আর্থিক চাপের মধ্যে কাউন্সিল ট্যাক্স ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটেনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বর্তমান কাউন্সিল ট্যাক্স ব্যবস্থাকে অন্যায্য মনে করেন। একই সঙ্গে আগামী বছর নিজেদের বিল পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্ধেকেরও বেশি মানুষ।
ফেয়ারার শেয়ারের জন্য পরিচালিত জরিপে ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা কাউন্সিল ট্যাক্সকে অন্যায্য বলেছেন। বিপরীতে মাত্র ২৫ শতাংশ এটিকে ন্যায্য মনে করেন। অর্থাৎ বর্তমান ব্যবস্থাকে অন্যায্য মনে করা মানুষের সংখ্যা ন্যায্য মনে করা মানুষের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। জরিপে অংশ নেন ২ হাজার ৪৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্রিটিশ নাগরিক এবং এটি ১ থেকে ৪ আগস্টের মধ্যে পরিচালিত হয়।
পরিবারের ব্যয়ের চাপ কমাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত—এমন প্রশ্নে ৪৯ শতাংশ মানুষ জ্বালানি বিল কমানোর পক্ষে মত দেন। এরপরই ৩৪ শতাংশ উত্তরদাতা কাউন্সিল ট্যাক্স কমানো অথবা পুরোপুরি পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেন। ব্যক্তিগত আয়করের ক্ষেত্রে করমুক্ত সীমা বাড়ানোর পক্ষে ছিলেন ২৯ শতাংশ মানুষ।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ইংল্যান্ডের কাউন্সিল ট্যাক্স নির্ধারণের পুরোনো কাঠামো। বর্তমান ব্যবস্থায় সম্পত্তির মূল্যায়ন ১৯৯১ সালের মূল্যমানের ওপর ভিত্তি করে করা হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়ির দামের পরিবর্তন হলেও কর কাঠামোতে তার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি। সমালোচকদের মতে, এর কারণে উত্তর ও মিডল্যান্ডসের কিছু এলাকার বাসিন্দারা তুলনামূলকভাবে বেশি করের চাপ বহন করছেন, যেখানে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সম্পত্তির মূল্য অনেক বেশি বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম অতীতে বর্তমান কাউন্সিল ট্যাক্স ব্যবস্থাকে অন্যায্য এবং সম্পত্তির ওপর করের ক্ষেত্রে ভূমির পর্যাপ্ত কর না নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কাউন্সিল ট্যাক্স ও স্ট্যাম্প ডিউটি বাতিল করে নতুন কোনো সম্পত্তি কর চালুর পরিকল্পনা নাকচ করেছেন। জুলাইয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানিয়েছিলেন, এত বড় পরিসরের পরিবর্তন এখনই আনা হচ্ছে না।
তবে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপের মধ্যে কাউন্সিল ট্যাক্স সংস্কারের দাবি আবারও জোরালো হচ্ছে। ফেয়ারার শেয়ার নামে প্রচারণাকারী সংগঠন কাউন্সিল ট্যাক্স ও স্ট্যাম্প ডিউটির পরিবর্তে একটি বার্ষিক ‘প্রোপোরশনাল প্রপার্টি ট্যাক্স’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। এই ব্যবস্থায় সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে মালিকদের কাছ থেকে কর নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, অর্থাৎ করের বোঝা ভাড়াটিয়ার পরিবর্তে সম্পত্তির মালিকের ওপর পড়বে।
জরিপে এই বিকল্প ব্যবস্থার প্রতিও উল্লেখযোগ্য জনসমর্থনের চিত্র উঠে এসেছে। ৪৭ শতাংশ উত্তরদাতা কাউন্সিল ট্যাক্স ও স্ট্যাম্প ডিউটির পরিবর্তে বার্ষিক আনুপাতিক সম্পত্তি কর চালুর প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন। বিপরীতে ১৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন এবং ২৭ শতাংশ সমর্থন বা বিরোধিতা—কোনোটিই করেননি।
ফেয়ারার শেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রু ডিক্সন বলেন, বড় ধরনের সম্পত্তি কর সংস্কারে তাড়াহুড়ো না করে এর সম্ভাব্য প্রভাব ভালোভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে তার মতে, সতর্কতার অজুহাতে কাউন্সিল ট্যাক্স সংস্কারকে দীর্ঘদিনের জন্য ‘অসম্ভব’ বিষয় হিসেবে রেখে দেওয়া উচিত নয়। তিনি বর্তমান ব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন পর্যালোচনা কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে বিকল্প করব্যবস্থার প্রভাব, আবাসন বাজারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং একটি ন্যায্য রূপান্তর প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করা যায়।
লেবার পার্টির এমপি জোনাথন ব্র্যাশও কাউন্সিল ট্যাক্সকে ব্রিটেনের অন্যতম পশ্চাদমুখী কর হিসেবে সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, যেসব এলাকায় মানুষের আয় তুলনামূলকভাবে কম, সেসব এলাকার বাসিন্দাদের অনেক সময় বেশি কর দিতে হচ্ছে। তার মতে, কাউন্সিল ট্যাক্সের পরিবর্তে সম্পত্তির মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি করব্যবস্থা চালু করা হলে সাধারণ মানুষের হাতে অর্থের পরিমাণ বাড়তে পারে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ম্যানচেস্টার রাশোলমের লেবার এমপি আফজাল খানও প্রস্তাবিত পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার দাবি, তার নির্বাচনী এলাকায় ৯০ শতাংশের বেশি পরিবার নতুন ধরনের সম্পত্তি কর ব্যবস্থায় বছরে গড়ে ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমাতে এ ধরনের সংস্কার সরকারের বিবেচনা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
তবে কাউন্সিল ট্যাক্স বাতিল বা বড় ধরনের পরিবর্তন সহজ সিদ্ধান্ত নয়। স্থানীয় সরকারগুলোর অর্থায়নে কাউন্সিল ট্যাক্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা চালু করলে স্থানীয় পরিষদগুলোর আয় কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, বিভিন্ন মূল্যের সম্পত্তির মালিকদের ওপর করের প্রভাব কতটা হবে এবং আবাসন বাজারে এর প্রভাব কী হতে পারে—এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগও রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। জরিপে আগামী বছর নিজেদের বিল পরিশোধ নিয়ে ৫২ শতাংশ মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ফলে কাউন্সিল ট্যাক্স সংস্কারের দাবি শুধু করব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি সরাসরি পরিবারগুলোর দৈনন্দিন ব্যয় ও জীবনযাত্রার চাপের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের সরকার কাউন্সিল ট্যাক্সের তাৎক্ষণিক পরিবর্তন থেকে বিরত থাকলেও জনমত, স্থানীয় পর্যায়ের চাপ এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে বিষয়টি আগামী দিনের বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হতে পারে। ফেয়ারার শেয়ারও কাউন্সিল ট্যাক্স ও স্ট্যাম্প ডিউটি বাতিল করে আনুপাতিক সম্পত্তি কর চালুর প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে।
সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট
এম.কে

