ব্রিটিশ নাগরিকত্ব আবেদনে বিতর্কিত ‘গুড ক্যারেক্টার’ নীতিমালার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়েছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। উচ্চ আদালতে শুনানির ঠিক আগে সরকার তিনটি মামলায় নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছে। একই সঙ্গে এসব মামলার আবেদনকারীদের আইনি ব্যয়ও সরকারকে বহনের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘গুড ক্যারেক্টার’ নির্দেশিকা সংশোধন করে জানায়, যারা অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন অথবা বৈধ প্রবেশ অনুমতি ছাড়া বিপজ্জনক পথে দেশটিতে এসেছেন, তাদের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব আবেদন সাধারণভাবে প্রত্যাখ্যান করা হবে। নীতিটি অতীতে আগত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য করা হয়, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
এই নীতির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উইলসন সলিসিটরস চারটি প্রধান জুডিশিয়াল রিভিউ মামলা দায়ের করে। আবেদনকারীদের অভিযোগ ছিল, নির্দেশিকায় শরণার্থী কনভেনশনের ৩১ ও ৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এছাড়া নীতিটি বৈষম্যমূলক, অযৌক্তিক এবং প্রশাসনিক আইনের পরিপন্থী বলেও দাবি করা হয়।
গত ৯ জুন উচ্চ আদালতে শুনানির আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তিন আবেদনকারী—জিইউএন, এনইএ এবং এইচসিএইচ-এর নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যানের মূল সিদ্ধান্ত ও পুনর্বিবেচনার পর বহাল রাখা সিদ্ধান্ত উভয়ই প্রত্যাহার করে নেয়। আদালত এসব মামলায় আবেদনকারীদের আইনি ব্যয় সরকারকে বহনের নির্দেশ দেন।
চতুর্থ আবেদনকারী সিবিডব্লিউ তখনও নাগরিকত্বের আবেদন করেননি। ফলে আদালত তার মামলাকে অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচনা করে প্রত্যাহারের অনুমতি দেন। কারণ ভবিষ্যতে তার আবেদন ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল প্রকাশিত সংশোধিত নির্দেশিকা বা সংস্করণ-৭ অনুযায়ী বিবেচিত হবে।
এর আগে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘গুড ক্যারেক্টার’ নির্দেশিকার নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে। সরকার একে কেবল ‘প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা’ হিসেবে উল্লেখ করলেও এতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি শিশু অবস্থায় অথবা মানবপাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে থেকে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করে থাকেন, তাহলে সাধারণভাবে সেই বিষয়টি উপেক্ষা করা হবে। এছাড়া শরণার্থী কনভেনশনের ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদের সুরক্ষা প্রযোজ্য হলে শুধুমাত্র অবৈধ প্রবেশের কারণে নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করা যাবে না।
নতুন নির্দেশিকা প্রকাশের পর উইলসন সলিসিটরস সমঝোতার একটি প্রস্তাব দেয়। তারা চেয়েছিল, সংস্করণ-৬ অনুযায়ী যাদের নাগরিকত্ব আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তারা যেন কোনো অতিরিক্ত ফি ছাড়াই নতুন সংস্করণ অনুযায়ী পুনর্বিবেচনার সুযোগ পান। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।
এদিকে আদালতে শুনানির সময় সরকার দাবি করে, সংস্করণ-৬ এবং সংস্করণ-৭ বাস্তবে একইভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং নতুন সংস্করণে কেবল কিছু ব্যাখ্যা যুক্ত করা হয়েছে। যদিও আইনজীবীদের মতে, নতুন নির্দেশিকায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আবেদনকারীদের জন্য তা উল্লেখযোগ্য সুবিধা সৃষ্টি করেছে।
এ মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি পৃথক মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সেই মামলার রায় পরে ঘোষণা করা হবে।
আইনজীবীরা সতর্ক করে বলেছেন, যেসব ব্যক্তি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আদালতের বিশেষ আদেশের মাধ্যমে জুডিশিয়াল রিভিউ আবেদনের সময়সীমা বৃদ্ধি পেয়েছিলেন, তাদের অবশ্যই ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে আদালতে আবেদন করতে হবে। অন্যথায় তারা সেই সুযোগ হারাতে পারেন।
এছাড়া যাদের নাগরিকত্ব আবেদন সংস্করণ-৬ অনুযায়ী প্রত্যাখ্যাত হয়েছে কিংবা পুনর্বিবেচনার পরও বাতিল রয়েছে, তাদের দ্রুত আইনগত পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তারা জুডিশিয়াল রিভিউ, পুনর্বিবেচনার আবেদন অথবা নতুন করে নাগরিকত্ব আবেদন করার সুযোগ বিবেচনা করতে পারেন।
এর পাশাপাশি ১৫ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকত্ব পুনর্বিবেচনা সংক্রান্ত নতুন নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে। আগে পুনর্বিবেচনার আবেদনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না। এখন সিদ্ধান্তের তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে আবেদন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে এটি কঠোর সময়সীমা নয়; যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারলে বিলম্বে করা আবেদনও বিবেচনা করা হতে পারে বলে নির্দেশিকায় উল্লেখ রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিতর্কিত ‘গুড ক্যারেক্টার’ নীতির আওতায় যাদের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল, তাদের অনেকের জন্য নতুন করে আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথও উন্মুক্ত হতে পারে।
সূত্রঃ ফ্রি মুভমেন্ট
এম.কে

