গণআন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আকস্মিক ক্ষমতাচ্যুতির পেছনে একটি প্রভাবশালী ‘চট্টগ্রাম বলয়’ এবং শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়টি সামনে এসেছে। ভারতভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এসব উপাদান সম্মিলিতভাবে তার রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে এবং শেষপর্যন্ত পতন ত্বরান্বিত করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। বরং শেখ রেহানা ও ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের প্রভাবের কারণে সরকারপ্রধান সেনাপ্রধানসহ গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন। নির্বাচনের আগেই তার চারপাশে একটি শক্তিশালী ‘চট্টগ্রাম বলয়’ গড়ে ওঠে, যেখানে উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা প্রভাব বিস্তার করেন।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তে প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা কাঠামোর ওপর নির্ভরতা তার জন্য কৌশলগত ভুল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে কিছু গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের নীতির বিপরীতে অবস্থান নিতে শুরু করে এবং চলমান আন্দোলনকে সংঘাতমুখী করে তোলে। ডিবি কার্যালয়ে ছয়জন ছাত্রনেতাকে আটকে রেখে জোরপূর্বক বিবৃতি নেওয়ার ঘটনাকে ‘আত্মঘাতী ফাঁদ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা জনঅসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দেয়।
সবচেয়ে আলোচিত দাবি হিসেবে বলা হয়, ৫ আগস্ট গণভবনে একটি সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করে শেখ হাসিনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলার পরিকল্পনা ছিল।
উদ্দেশ্য ছিল দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের পথ সুগম করা। তবে একটি বিদেশি নিরাপত্তা সূত্রের হস্তক্ষেপে সেই পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই দিনে ঢাকায় প্রবেশে বাঁধা হিসেবে থাকা নিরাপত্তা ব্যারিকেড হঠাৎ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে।
এর ফলে আন্দোলনকারীদের রাজধানীতে প্রবেশ সহজ হয় এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়।
শেখ হাসিনা নিজেও সাম্প্রতিক বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, তাকে নিরাপত্তার কারণে অন্যত্র নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা দেওয়া হলেও পরে তিনি বুঝতে পারেন পরিস্থিতি ভিন্ন। নিরাপত্তা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাকে টুঙ্গিপাড়ায় নেয়া হতে পারে বলে তিনি ধারনা করেছিলেন বলে জানান কিন্তু এসএসএফের পাহাড়ায় তাকে কুর্মিটোলার বাশার ঘাঁটিতে নেয়া হয় এবং তখন তিনি উপলব্ধি করেন যে, তার ক্ষমতা কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
দেশত্যাগ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বিদেশি সহযোগিতায় তাকে দ্রুত দেশত্যাগে রাজি করানো হয় এবং তিনি দেশ ছাড়েন।
প্রতিবেদনে জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট একটি বিতর্কিত প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে দেশের ভেতরে সামরিক ঘাঁটি ও আঞ্চলিক করিডোর তৈরির পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। যদিও এসব দাবি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সরকার পতনের পর সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলেও অন্যদের পালাতে সহায়তার অভিযোগ এসেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে নতুন শক্তির উত্থান এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অস্থিরতার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে উল্লিখিত সব দাবি একটি বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না পাওয়ায় বিষয়গুলো যাচাই সাপেক্ষ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্রঃ আজকের কন্ঠ
এম.কে

