23.8 C
London
June 17, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশসিলেট

শাহজালাল-শাহপরাণ মাজারের কোটি কোটি টাকার দান কোথায় যায়? হিসাব চেয়ে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন

সিলেটের আধ্যাত্মিক পরিচয়ের অন্যতম দুই কেন্দ্র হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজারে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার দান, নজরানা ও উপঢৌকন জমা হলেও সেই অর্থের ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অস্বচ্ছতার অভিযোগ এবার প্রশাসনের নজরে এসেছে। প্রথমবারের মতো মাজার দুটির আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব চেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সিলেট জেলা প্রশাসন।
সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের সভাপতিত্বে গত ১০ জুন এক সভায় শাহজালাল ও শাহপরাণ মাজারের পরিচালনা কমিটি, মোতাওয়াল্লি, ওয়াকফ প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষকে আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে সভায় মাজার কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিনের আয়ের কোনো সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য হিসাব দেখাতে পারেনি বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
সিলেটকে দেশের ‘আধ্যাত্মিক রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজারের। দেশ-বিদেশ থেকে আগত লাখো দর্শনার্থী ও ভক্ত প্রতিবছর এসব মাজারে জিয়ারত করতে আসেন। তারা নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন ধরনের দান-সদকা ও নজরানা প্রদান করেন। কিন্তু এসব দানের অর্থ ও সম্পদের ব্যবস্থাপনা কীভাবে হয়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জনমনে প্রশ্ন ছিল।
বর্তমানে শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫ কোটি টাকা সরকার প্রদান করছে এবং বাকি পাঁচ কোটি টাকা মাজার কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা। তবে সেই অর্থ দিতে গড়িমসি করায় প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। পাঁচ কোটির মধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশন তিন কোটি টাকা দিয়েছে, কিন্তু অবশিষ্ট দুই কোটি টাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় পরিকল্পনা কমিশন মাজারের আয়ের উৎস ও আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চেয়েছে।
শুক্রবার মাজার এলাকা পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, মাজারে আসা নগদ অর্থ, পশু কিংবা অন্যান্য নজরানার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব সংরক্ষণ করা হয় না। আয়-ব্যয়ের বিষয়ে মাজার কর্তৃপক্ষ কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি।
তিনি বলেন, “কিছু ব্যক্তি মাজারের আয় সংগ্রহ করেন এবং নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারার মাধ্যমে তা ব্যয় করেন। যেহেতু এটি একটি পাবলিক প্রপার্টি, তাই এখন থেকে আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড সংরক্ষণ এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
এদিকে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ধর্মীয় ও সামাজিক নেতারা। সিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবিব আহমদ শিহাব বলেন, মাজারের প্রতিদিন, সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক আয় কত এবং সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়, তার কোনো নির্ভরযোগ্য বার্ষিক অডিট বা স্বচ্ছ হিসাব এতদিন দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, “মানুষ লাখ লাখ টাকা দান করেন, গরু-ছাগল মান্নত করেন। এসব দানের প্রকৃত হকদার গরিব ও এতিমরা। তাই মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।”
অন্যদিকে শাহজালাল মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান স্বীকার করেছেন যে দান থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ পরিচালনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভোগ করেন। তবে তিনি দাবি করেন, সেই অর্থ মাজারের বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন ব্যয় নির্বাহে ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, “আমরা যে খাচ্ছি না, তা নয়। আমরা খাচ্ছি, আবার মাজারের খরচও বহন করছি। এভাবেই বহু বছর ধরে ব্যবস্থা চলে আসছে।”
তবে মাজার কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রশাসনের সভার আগে পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনের আচরণে তারা বিস্মিত বলেও মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে মাজার, মসজিদ ও মাদরাসাকে সমন্বিতভাবে একটি আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে মাদরাসার শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বহু বছর ধরে আলোচিত শাহজালাল ও শাহপরাণ মাজারের আয়-ব্যয়ের রহস্য উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন সিলেটবাসী। একই সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এম.কে

আরো পড়ুন

১০ বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি নাঃ মতিউর রহমান

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ৮ বার্তা, প্রজ্ঞাপন চূড়ান্ত সমাধান নয়

পাকিস্তানের চাকরি ছেড়ে মানবিক টানে টনি হেমিংয়ের বাংলাদেশ ফেরা