23.8 C
London
July 28, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

চার দেশের শিক্ষার্থী ভিসা নিষেধাজ্ঞা চ্যালেঞ্জঃ ব্রিটিশ হাইকোর্টে লড়ছেন অক্সফোর্ডে সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও

সুদান, আফগানিস্তান, ক্যামেরুন ও মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য শিক্ষার্থী ভিসা স্থগিত করার যুক্তরাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে ব্রিটিশ হাইকোর্টে আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, হোম অফিসের এই নীতির কারণে অক্সফোর্ড, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন, ব্রিস্টল, গ্লাসগো, সাসেক্স, ব্র্যাডফোর্ড, ম্যানচেস্টার ও কিংস কলেজ লন্ডনের মতো শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া একাধিক মেধাবী শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন শেষ মুহূর্তে ভেঙে গেছে।

সোমবার হাইকোর্টে অনুষ্ঠিত শুনানিতে জানানো হয়, সুদান, আফগানিস্তান ও ক্যামেরুনের সাতজন সম্ভাব্য নারী শিক্ষার্থী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের মার্চ মাসের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ওই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চার দেশের নাগরিকদের জন্য শিক্ষার্থী ভিসা প্রদান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় হোম অফিস।

সরকারের দাবি, কিছু বিদেশি শিক্ষার্থী শিক্ষার্থী ভিসাকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে পরে আশ্রয়ের আবেদন করছেন। এই প্রবণতা ঠেকাতে ভিসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে আবেদনকারীদের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, এই নীতি প্রকৃত অপব্যবহারকারীদের নয়, বরং অসংখ্য নির্দোষ ও যোগ্য শিক্ষার্থীকেই শাস্তির মুখে ফেলেছে। তাদের ভাষ্য, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তারাও একইভাবে ভিসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

 

মামলার অন্যতম আবেদনকারী সুদানের চিকিৎসক ডা. ফারাহ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাইড ডিজিটাল হেলথ বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। তার পরিকল্পনা ছিল পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হওয়ার।

আরেক আবেদনকারী মিস আলি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে নারী স্বাস্থ্য বিষয়ে স্নাতকোত্তরের সুযোগ পেয়েছেন। তিনি যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে সুদানে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণ (এফজিএম) প্রতিরোধে কাজ করতে চান।

সুদানের আরেক আবেদনকারী মিস রাদও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। তার লক্ষ্য সংঘাতকবলিত সুদানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

সুদানি আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী টিম বুলে কিংস কাউন্সেল আদালতে বলেন, আবেদনকারীরা “উদাহরণযোগ্য শিক্ষার্থী”, যারা উচ্চশিক্ষার জন্য বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু অল্প সময়ের নোটিশে তাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। তিনি বলেন, তাদের কেউ যুক্তরাজ্যে থেকে যাওয়া বা আশ্রয়ের আবেদন করবেন—এমন কোনো প্রমাণ সরকারের কাছে নেই।

 

তিনি আরও জানান, আদালত আবেদনকারীদের পক্ষে রায় দিলে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ভর্তি প্রস্তাব বহাল রাখায় মিস রাদের এখনও চলতি বছর পড়াশোনা শুরু করার সুযোগ রয়েছে।

আদালতে আরও অভিযোগ করা হয়, চার দেশের নাগরিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে হোম অফিস যে পরিসংখ্যান ব্যবহার করেছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবেদনকারীদের আইনজীবীদের মতে, সরকার এক বছরে ইস্যু করা শিক্ষার্থী ভিসার সংখ্যা এবং একই বছরে করা আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা তুলনা করেছে। অথচ অনেক শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যে আসার কয়েক বছর পর আশ্রয়ের আবেদন করেন। ফলে এই পরিসংখ্যান বিভ্রান্তিকর এবং ভুল সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়েছে।

তারা আরও বলেন, কোনো নির্দিষ্ট বছরে কোনো দেশের শিক্ষার্থীদের আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক নিপীড়ন বা নিরাপত্তা পরিস্থিতির মতো সাময়িক কারণ থাকতে পারে। তাই এসব তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নির্ধারণ করা বা পুরো একটি দেশের নাগরিকদের ভিসা থেকে বঞ্চিত করা যৌক্তিক নয়।

আফগানিস্তানের আবেদনকারী মিস সাদাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার জন্য সাসেক্স ও ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিঃশর্ত ভর্তি প্রস্তাব পেয়েছেন। আরেক আফগান শিক্ষার্থী ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চান।

ক্যামেরুনের আবেদনকারী মিস ফর্কওয়া শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংঘাত নিরসন বিষয়ে গবেষণার জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও কিংস কলেজ লন্ডন থেকে পিএইচডির প্রস্তাব পেয়েছেন। আরেক সুদানি আবেদনকারী মিস খলিফা ব্রিস্টল ও গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার সুযোগ পেয়েছেন।

 

অন্য চার আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী রাজা হুসেইন কিংস কাউন্সেল লিখিত বক্তব্যে বলেন, এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা সংশ্লিষ্ট নারীদের জন্য “একটি বিশাল ধাক্কা”। কারণ যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়ার আগে তারা প্রত্যেকেই নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছেন।

অন্যদিকে হোম অফিস আদালতে জানায়, গত এক দশকে বৈধ ভিসাধারীদের আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে বৈধ ভিসাধারীদের মধ্যে ৪১ হাজার জন আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, যার ৪৭ শতাংশই শিক্ষার্থী ভিসাধারী।

সরকারের মতে, বৈধ শিক্ষার্থী ভিসা যদি যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করে পরে আশ্রয় দাবির একটি পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে দেশের অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সেই কারণেই চার দেশের নাগরিকদের জন্য শিক্ষার্থী ভিসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এখন এই মামলায় হাইকোর্টের রায়ের ওপর নির্ভর করছে, ভিসা নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে নাকি মেধাবী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আবারও যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে যাবে।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

প্রতিদিন যৌন সহিংসতার মুখে যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী, জিরো টলারেন্স নীতি প্রশ্নবিদ্ধ

দরিদ্র দেশগুলোতে ১০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন দেবে যুক্তরাজ্য

বন্ধ হয়ে যেতে পারে ইংল্যান্ডের শতাধিক কেয়ার হোম