26.8 C
London
June 25, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

জনশূন্য গ্রাম বাঁচাতে ইতালির ‘১ ইউরোর বাড়ি’ প্রকল্পঃ মিলছে মিশ্র ফলাফল

মাত্র ১ ইউরো, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪০ টাকারও কম দামে একটি বাড়ি কেনার সুযোগ। এমন আকর্ষণীয় প্রস্তাব গত কয়েক বছরে বিশ্বের হাজারো মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। জনসংখ্যা হারাতে থাকা গ্রামীণ জনপদগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে চালু করা হয়েছিল ‘১ ইউরোর বাড়ি’ প্রকল্প। তবে বাস্তবে এই স্বপ্নের পেছনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ, অতিরিক্ত ব্যয় এবং সামাজিক জটিলতা।

ইতালির সিসিলি দ্বীপের মুসোমেলি শহর এই প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি। শহরটির সাবেক মেয়র জিউসেপ্পে কাতানিয়ার দাবি অনুযায়ী, এখানে ১৮টি দেশের নাগরিকদের কাছে প্রায় ৫৫০টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা ইতালির অন্য যেকোনো শহরের তুলনায় বেশি। এর ফলে শহরে কয়েক মিলিয়ন ইউরোর বিনিয়োগও এসেছে।

প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিত্যক্ত ও জনশূন্য হয়ে পড়া গ্রামীণ এলাকাগুলোতে নতুন বাসিন্দা আনা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করা এবং স্থানীয় সমাজে নতুন প্রাণ সঞ্চার করা। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা যাচ্ছে, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।

জার্মান নাগরিক বারবারা মার্কল দুই বছর আগে মুসোমেলিতে বসবাস শুরু করেন। তিনি ভেবেছিলেন সারা বছর উষ্ণ আবহাওয়ার মধ্যে জীবন কাটাবেন। কিন্তু পরে বুঝতে পারেন, শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০০ মিটার উঁচুতে হওয়ায় শীতকালে তুষারপাতও হয়। অধিকাংশ পুরোনো বাড়িতে আধুনিক তাপব্যবস্থা নেই এবং জানালা-দরজার অবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে নড়বড়ে।

তার ভাষায়, “আমি ভেবেছিলাম এটি হবে স্বপ্নের জীবন। কিন্তু পরে বুঝেছি কেন বাড়িগুলোর দাম মাত্র ১ ইউরো রাখা হয়েছিল।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক বিদেশি বাড়ি কিনলেও বছরের বেশিরভাগ সময় সেখানে থাকেন না। তারা কেবল গ্রীষ্মকাল বা ছুটির সময়ে কয়েক সপ্তাহের জন্য আসেন। ফলে প্রকল্পের মাধ্যমে স্থায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা স্থানীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সীমিত হয়ে পড়ছে।

বর্তমান মেয়র জিয়ানলুকা নিগ্রেল্লি জানিয়েছেন, বিশেষ করে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে এই প্রকল্পের জনপ্রিয়তা বেশি। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে আসা অনেকের পক্ষে ইতালিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করা সহজ নয়। ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততাও সীমিত থাকে।

অন্যদিকে, ১ ইউরোর বাড়ি কেনার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় সংস্কার ব্যয়। অনেক বাড়িই দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। ফলে ছাদ, দেয়াল, বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানির লাইন এবং কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়।

ব্রিটিশ নাগরিক জর্জ লেইং, যিনি নিজেও একাধিক ১ ইউরোর বাড়ির মালিক, বলেন, “মানুষ ভাবে ১ ইউরোতে বাড়ি কিনে খুব কম খরচে সেটি বাসযোগ্য করে তুলবে। বাস্তবে এসব বাড়ি অর্থ ব্যয়ের শেষ নেই এমন প্রকল্পে পরিণত হয়।”

তিনি জানান, একটি বাড়ি সংস্কারে অন্তত ১০ হাজার ইউরো থেকে শুরু করে ১ লাখ ইউরো পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

ব্রিটিশ দম্পতি মিয়া ও টম ২৭ হাজার ইউরো দিয়ে একটি বাড়ি কিনে স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস শুরু করেছেন। তারা বলছেন, শুধু বাড়ি কেনাই যথেষ্ট নয়; স্থানীয় সমাজের অংশ হতে হলে দীর্ঘ সময় সেখানে থাকতে হয় এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়।

তাদের মতে, “বছরে কয়েকবার এসে কাজের অগ্রগতি দেখা সম্ভব নয়। এখানে থাকতে হবে, স্থানীয়দের সঙ্গে মিশতে হবে, তবেই কাজ এগোয়।”

এদিকে অনেক বিদেশি বাড়ি কিনে পরে নানা অপ্রত্যাশিত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। কেউ দেখেছেন জানালা দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকছে, কেউ আবার পরিত্যক্ত পাশের বাড়ি থেকে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের কারণে সমস্যায় পড়েছেন।

তবে প্রকল্পটির ইতিবাচক দিকও রয়েছে। কিছু বিদেশি স্থানীয় সমাজের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন। ব্রিটিশ নাগরিক ড্যানি ম্যাককাবিন স্থানীয়দের জন্য একটি কমিউনিটি রান্নাঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করে অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

তার মতে, “এটি দ্রুত লাভ করার কোনো প্রকল্প নয়। এখানে সফল হতে চাইলে শুধু অর্থ নয়, সময়, শ্রম এবং স্থানীয় সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাও প্রয়োজন।”

বিশ্লেষকদের মতে, ইতালির ‘১ ইউরোর বাড়ি’ প্রকল্প বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করলেও এটি কোনো সহজ বা দ্রুত লাভের সুযোগ নয়। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, সংস্কার ব্যয় এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার একটি জটিল প্রক্রিয়া।

তবে স্থানীয় সমাজে মিশে যেতে আগ্রহী এবং দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের পরিকল্পনা রয়েছে—এমন মানুষের জন্য প্রকল্পটি এখনও নতুন জীবন শুরু করার এক ব্যতিক্রমী সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

ইসরায়েলের হামলা নিয়ে ইরানের ভিন্ন তথ্য

ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিল পর্তুগালও

নিউইয়র্কে বাড়িতে ঢুকে হামলা, শিশুসহ একই পরিবারের ৪ জন নিহত