সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চলতি বছর নবসৃষ্ট হাজীপুর বালু মহালের ইজারাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ নির্ধারিত কয়েকটি মৌজার পরিবর্তে তারও বাইরে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করে ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে দিন-রাত বালু উত্তোলন করছে। এতে পরিবেশ, কৃষিজমি, বসতভিটা এবং জাফলংয়ের পর্যটন সম্ভাবনা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে দাবি এলাকাবাসীর।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি লাটি, লাবু, কালিজুরি ও দক্ষিণ প্রতাপপুর মৌজায় সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের অনুমতি পেলেও বাস্তবে পশ্চিম জাফলং, গোয়াইনঘাট সদর ও মধ্য জাফলং ইউনিয়নের উত্তর প্রতাপপুর, লুনি, আমবাড়ি ও দক্ষিণ প্রতাপপুর এলাকায় কয়েক হাজার ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ-এর আড়ালে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ করছেন লুনি গ্রামের খায়রুল আমিন ও কামরুল ইসলাম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, অতীতে তারা আওয়ামী লীগের পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করতেন। বর্তমানে তারা মন্ত্রী আরিফুল হকের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, যদি সত্যিই মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন—এ প্রশ্ন তাদের। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, এ কারণেই অবৈধ কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ পরিচয়দানকারী স্টারলিং তেয়ারিং নামের এক স্থানীয় নেতার ছায়াও খায়রুল-কামরুলের ওপর রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বিভিন্ন গ্রাম, জনপদ ও অসংখ্য বসতবাড়ি। একই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়েছে জাফলং চা বাগানের মালিকানাধীন তিনটি খেলার মাঠ।
প্রতাপপুর ও পাঁচহাতিখেল এলাকার পিয়াইন নদীর আনন্দ খাল অংশে কয়েক মাস ধরে পেলোডার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি চক্র খালের তীরে অসংখ্য গভীর গর্ত সৃষ্টি করেছে। বতবাড়ি এলাকার ফসলি জমিও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। কখনও দিনের আলোয়, কখনও রাতের আঁধারে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ। অভিযুক্তদের মধ্যে খায়রুল আমিন, কামরুল ইসলাম, ফয়জুল ইসলাম, তোফায়েল আহমদ ও দেলোয়ার হোসেনের নাম উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা।
একাধিক ভিডিও ও ছবিতে রাতের আঁধারে টর্চলাইটের আলোয় শত শত মানুষের বালু উত্তোলনের দৃশ্য এবং দিনের বেলায় বিপুল সংখ্যক ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের চিত্র দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
শ্রমিকদের দাবি, প্রতিদিন কয়েকশ বাল্কহেড ও কার্গো জাহাজে নদীপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই বালু পাঠানো হচ্ছে। প্রতিদিন কয়েক লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন হয় এবং এর বাজারমূল্য দুই থেকে তিন কোটির টাকারও বেশি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জাফলংয়ে অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত একটি চক্র এখন প্রতাপপুর এলাকাতেও সক্রিয়। তাদের অনেকেই অতীতে জাফলং ধ্বংসের অভিযোগে আলোচিত ছিলেন এবং লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। খায়রুল, কামরুলসহ অনেকের বিরুদ্ধে গত এক যুগে ২৫ থেকে ৩০টি মামলা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে অধিকাংশ মামলায় তারা আপস, চাপ বা মামলা প্রত্যাহারের মাধ্যমে রেহাই পেয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
গত ১৩ জানুয়ারি দক্ষিণ প্রতাপপুরের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বুলবুল খায়রুল, নুরুলসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় তাকে মারধরের অভিযোগ আনা হয়।
এছাড়া গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দক্ষিণ প্রতাপপুরের এমদাদুর রহমান এলাকাবাসীর পক্ষে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করে বালু উত্তোলন, চাঁদাবাজি, নদীতীর ভাঙন এবং বসতভিটা বিলীন হওয়ার অভিযোগ করেন। একই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ প্রতাপপুরের বিল্লাল হোসেনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র সহকারী কমিশনার রিপামনি দোবি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দেন।
এলাকাবাসীর পক্ষে মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক গত বছরের ২৬ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কাছে ফুটবল মাঠ ও সংলগ্ন এলাকা থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের আবেদন জানান। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, এতসব অভিযোগ ও আবেদন সত্ত্বেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন উভয় স্থান থেকেই বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বালু উত্তোলনের কারণে জাফলং চা বাগানের লুনি ফুটবল মাঠ এবং দক্ষিণ প্রতাপপুরের আরও দুটি ফুটবল মাঠ বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে লুনি গ্রামের অমৃকা লাল ও কুলন্দ নাথের বাড়ি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ প্রতাপপুরের আব্দুল জলিল, আবুল হোসেন, কমল নাথসহ অনেকের বসতবাড়িও ঝুঁকির মুখে। হাজীপুর এলাকায় পিয়াইন নদীর বিভিন্ন অংশে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে ফসলি জমি ও বাড়িঘর নদীতে বিলীন হচ্ছে বলে অভিযোগ। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে হেলেনা বেগম ও তরিক উল্লাহর নাম উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের বিষয়ে খায়রুল আমিন বলেন, বালু উত্তোলনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। হাজীপুর বালুমহালের ইজারাদাররা কীভাবে বালু উত্তোলন করছে, তা তার জানা নেই। এলাকায় তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও নেই বলে তিনি দাবি করেন।
মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হাফিজ আব্দুল্লাহ বলেন, তিনি শুধুমাত্র লাটি, লাবু, কালিজুরি ও দক্ষিণ প্রতাপপুর মৌজায় সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করছেন। ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়টি তার জানা নেই।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, খায়রুলসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য প্রশাসনের কাছে রয়েছে। সম্প্রতি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি এবং প্রভাবশালী মহলের প্রশ্রয়ের কারণেই অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয় সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালী চক্র সাহস পাচ্ছে। ফলে দেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ জাফলংয়ের পরিবেশ, নদী, কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। তবে এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া
এম.কে

