সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে ভাইরাল হওয়া সিসিটিভি ফুটেজের ঘটনায় নতুন মোড় এসেছে। শুরুতে ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করা হলেও পরে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার এবং বেঙ্গল লেন্স জানায়, ভিডিওটিতে এআই বা ডিজিটাল সম্পাদনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং এটি আসল ফুটেজ। এরপর ভিডিওতে থাকা তরুণী ও তার বাবা প্রকাশ্যে এসে দাবি করেন, গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ওই তরুণীর বৈধ ইসলামি ও আইনসম্মত বিয়ে হয়েছে।
অনুসন্ধানভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভিডিওতে থাকা তরুণী মরিয়ম খাতুন এবং তার বাবা মাসুম বিল্লাহর সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হয়। সেখানে মরিয়ম খাতুন বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম তার বৈধ স্বামী এবং পারিবারিক সম্মতিতেই তাদের বিয়ে হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন তারা একসঙ্গে বাইরে ঘুরতে বের হয়ে পরে মগবাজারে তার বাবার অফিসে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়েছিলেন।
তরুণীর বাবা মাসুম বিল্লাহও দাবি করেন, গত ১৭ জুন রাজধানীর মগবাজারে তার কার্যালয়ে তিন লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করে এবং গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। তবে তিনি অভিযোগ করেন, তার আপন শ্যালক ও সংসদ সদস্যের গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ পারিবারিক বিরোধ ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ চুরি করে ব্ল্যাকমেইল এবং পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
এর আগে লিখিত বিবৃতিতে গাজী নজরুল ইসলাম জানান, গত ১৩ জুলাই তিনি তার প্রথম স্ত্রী মোসাম্মৎ মাকছুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহকে নিয়ে মগবাজারে শ্বশুর মাসুম বিল্লাহর অফিসে যান। সেখানে অবস্থানকালে চালক ওবায়দুল্লাহ পরিকল্পিতভাবে কয়েকজন বহিরাগতকে অফিসে প্রবেশ করিয়ে তাদের জিম্মি করেন এবং অর্থ দাবি করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংসদ সদস্যের দাবি, পরে তাকে এবং তার শ্বশুরকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়। তিনি ঘটনাটিকে পরিকল্পিত ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চরিত্রহননের অপচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার পর গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মোসাম্মৎ মাকছুদা বেগমও ভিডিওবার্তায় বলেন, মরিয়ম বেগম তার স্বামীর বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রী। বিষয়টি নিয়ে যারা কুৎসা রটাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
এদিকে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও দলটির মিডিয়া প্রধান মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, সংসদ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে দলকে জানিয়েছেন যে ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এই বিয়ে হয়েছে। তবে ভিডিওটি কীভাবে ফাঁস হলো এবং এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল কি না, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
তবে পুরো ঘটনায় এখনও বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। একজন সংসদ সদস্যকে জিম্মি করে চাঁদা দাবি, ব্যক্তিগত ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ এবং এত গুরুতর ঘটনার পরপরই কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা তাৎক্ষণিক আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি—তা নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক-এর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত আরেকটি রিলস ভিডিওকে ঘিরে। ওই ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, অতীতেও গাজী নজরুল ইসলামকে আরেক নারীর সঙ্গে জনতার হাতে আটকের একটি ঘটনা ঘটেছিল। তবে এই ভিডিওর সময়, স্থান, প্রেক্ষাপট কিংবা দাবিগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা গাজী নজরুল ইসলামের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে ভাইরাল ভিডিও, বৈধ দ্বিতীয় বিয়ের দাবি, ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ, এআই সংক্রান্ত বিভ্রান্তি এবং নতুন করে সামনে আসা পুরোনো ভিডিও—এসব ঘটনাকে ঘিরে গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিল বিতর্ক। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের এই ঘটনাগুলোর প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
সূত্রঃ ইত্তেফাক \ দ্য ডিসেন্ট
এম.কে

