যুক্তরাজ্যের হোম অফিস ইমিগ্রেশন রুলসে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে ‘স্টেটমেন্ট অব চেঞ্জেস এইচসি ৫৮৪’ প্রকাশ করেছে। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত এই নথিতে শিক্ষার্থী, ভিজিটর, স্কিলড ওয়ার্কার, আধুনিক দাসত্বের শিকার কর্মী, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সেটেলমেন্ট স্কিম এবং হংকং ব্রিটিশ ন্যাশনাল ওভারসিজ বা বিএনও রুটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন বিধান যুক্ত ও পুরোনো কিছু নিয়ম সংশোধন করা হয়েছে।
নতুন পরিবর্তনগুলোর বেশিরভাগ ৮ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। তবে সব নিয়ম একই দিনে কার্যকর হচ্ছে না। ধর্মীয় কর্মীসংক্রান্ত কিছু পরিবর্তন ২৯ অক্টোবর, শিক্ষার্থীদের আর্থিক সক্ষমতার নতুন নিয়ম ৩০ নভেম্বর এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সেটেলমেন্ট স্কিমের একটি পরিবর্তন ৯ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। ফলে কোন তারিখে আবেদন করা হচ্ছে এবং সেই সময় কোন নিয়ম কার্যকর রয়েছে, তা ভিসা আবেদনকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন হলো জীবনযাত্রার ব্যয় দেখানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাংক ব্যালেন্সের পরিমাণ বৃদ্ধি। ৩০ নভেম্বর ২০২৬ থেকে লন্ডনে পড়াশোনা করতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসের জন্য ১ হাজার ৫৭০ পাউন্ড এবং লন্ডনের বাইরে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে ১ হাজার ২০৩ পাউন্ড অর্থের প্রমাণ দেখাতে হবে। আগের হার ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ৫২৯ এবং ১ হাজার ১৭১ পাউন্ড।
সর্বোচ্চ নয় মাসের হিসাব ধরলে লন্ডনে পড়তে যাওয়া একজন শিক্ষার্থীর জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ হাজার ১৩০ পাউন্ড এবং লন্ডনের বাইরে ১০ হাজার ৮২৭ পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ দেখানোর প্রয়োজন হতে পারে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোর্সের টিউশন ফিও নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বিবেচনায় থাকবে। তবে যুক্তরাজ্যে বৈধ ভিসায় অন্তত ১২ মাস ধরে অবস্থানরত কিছু আবেদনকারী এই আর্থিক প্রমাণের শর্ত থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন।
ভিজিটর ভিসার ক্ষেত্রেও কিছু বিধান সহজ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের এরাসমাস প্লাস কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষামূলক কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ, জব শ্যাডোয়িং, দক্ষতা প্রতিযোগিতা এবং স্বল্পমেয়াদি ট্রেইনিশিপে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে এরাসমাস প্লাসের আওতায় যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে।
নতুন নিয়মে নির্দিষ্ট শিক্ষামূলক কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীরা সর্বোচ্চ ৩০ দিনের ট্রেইনিশিপ এবং কর্মক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ বা জব শ্যাডোয়িংয়ে অংশ নিতে পারবেন। ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোচিং ও প্রশিক্ষণমূলক কিছু কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের স্কুল ও একাডেমিগুলো এরাসমাস প্লাসের আওতায় সর্বোচ্চ ছয় মাসের নির্দিষ্ট স্টাডি প্লেসমেন্টে অংশগ্রহণকারীদের গ্রহণ করতে পারবে।
স্কিলড ওয়ার্কার রুটে আধুনিক দাসত্ব বা মানবপাচারের শিকার কর্মীদের জন্যও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোনো স্কিলড ওয়ার্কার ন্যাশনাল রেফারাল মেকানিজম বা এনআরএমে রেফার হওয়ার পর আধুনিক দাসত্বের বিষয়ে ইতিবাচক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পেলে নির্দিষ্ট শর্তে তার কাজের বিধিনিষেধ পরিবর্তন করা যাবে। এর ফলে যোগ্য কর্মী বর্তমান ভিসার বাকি সময়ের মধ্যে অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারবেন।
নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এসব কর্মী স্বনিয়োজিত কাজ এবং স্বেচ্ছাসেবী কাজও করতে পারবেন। তবে পেশাদার খেলোয়াড় বা ক্রীড়া প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার ওপর বিধিনিষেধ থাকবে। হোম অফিসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শোষণের শিকার কর্মীদের সুরক্ষা এবং নিয়োগকর্তার মাধ্যমে ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাসকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কমানো এই পরিবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ইমিগ্রেশন আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রেও নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে। ইমিগ্রেশন বেইলের শর্ত ভঙ্গ করা, নির্ধারিত রিপোর্টিংয়ে হাজির না হওয়া বা ইমিগ্রেশন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার মতো বিষয় ভবিষ্যতের কিছু আবেদনে বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। ফি মওকুফের আবেদন, আবেদন পরিবর্তন এবং বায়োমেট্রিক তথ্য জমা দেওয়ার সময়সীমা নিয়েও নিয়ম আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।
পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত ভিকটিম অব ডোমেস্টিক অ্যাবিউজ রুটেও পরিবর্তন এসেছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো আবেদনকারীর ১৮ বছরের বেশি বয়সী নির্ভরশীল সন্তানও নতুন বিধানের আওতায় আবেদন করার সুযোগ পেতে পারেন। বিশেষ করে পারিবারিক নির্যাতনের কারণে সম্পর্ক স্থায়ীভাবে ভেঙে যাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এই সংশোধন আনা হয়েছে।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সেটেলমেন্ট স্কিম বা ইইউএসএস-এও বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো ব্যক্তির পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেও তার প্রি-সেটেলড স্ট্যাটাস সরাসরি হারানোর বিষয়টি নতুন বিধানের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। পরিবারে যোগদানকারী সদস্যদের আবেদন এবং কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সন্তানদের স্ট্যাটাস নিয়েও সংশোধন আনা হয়েছে।
হংকং ব্রিটিশ ন্যাশনাল ওভারসিজ বা বিএনও রুটে নির্ভরশীল সন্তানদের সেটেলমেন্টের নিয়মেও পরিবর্তন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট ১৮ বছরের নিচের সন্তানদের ক্ষেত্রে যোগ্য বাবা বা মায়ের সঙ্গে সেটেলমেন্টের সুযোগ আরও স্পষ্ট করা হয়েছে এবং আলাদাভাবে পাঁচ বছরের ধারাবাহিক বসবাসের শর্তের প্রয়োগে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ভিজিটর রুটে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন রয়েছে। যুক্তরাজ্যে কোনো প্রশিক্ষণ নিতে হলে সেটি আবেদনকারীর নিজ দেশে পাওয়া যায় না—এমন প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা কিছু ক্ষেত্রে তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিল্পী, সংগীতশিল্পী ও বিনোদনকর্মীদের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিহার্সাল বা মহড়ায় অংশগ্রহণের সুযোগও স্পষ্ট করা হয়েছে।
ধর্মীয় কর্মীদের জন্য ব্যবহৃত টি-টু মিনিস্টার অব রিলিজিয়ন এবং টেম্পোরারি ওয়ার্ক–রিলিজিয়াস ওয়ার্কার রুটের কিছু পরিবর্তন ২৯ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্পনসরদের কর্মীর থাকা ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।
এদিকে নতুন আবেদনকারীদের জন্য বন্ধ থাকা স্টার্ট-আপ রুট, টি-ওয়ান ইনভেস্টর এবং টি-ওয়ান এন্টারপ্রেনার রুটের কিছু পুরোনো ও অপ্রাসঙ্গিক বিধানও ইমিগ্রেশন রুলস থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমানে চালু থাকা রুটগুলোর সঙ্গে নিয়মগুলোকে সামঞ্জস্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হোম অফিসের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, এইচসি ৫৮৪-এর সবচেয়ে বড় অংশ ৮ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে ২৯ অক্টোবর, ৩০ নভেম্বর এবং ৯ ডিসেম্বর বিভিন্ন পরিবর্তন বাস্তবায়িত হবে। ফলে ব্রিটেনে পড়াশোনা, কাজ, ভ্রমণ কিংবা বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে আবেদন জমা দেওয়ার তারিখের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রুটের নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার তারিখও বিবেচনা করতে হবে।
সূত্র: যুক্তরাজ্যের হোম অফিস—‘স্টেটমেন্ট অব চেঞ্জেস টু দ্য ইমিগ্রেশন রুলস: এইচসি ৫৮৪, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬’।
এমকে

