TV3 BANGLA
ফিচার

টিকটকে ভাইরাল ব্রিটিশ চাইনিজ টেকআউটঃ আমেরিকান বিস্ময়, ব্রিটিশ পরিচয়ের নতুন পাঠ

আমেরিকানদের কাছে চাইনিজ টেকআউট বলতে সাধারণত জেনারেল সো’স চিকেন, চাউ মেইন কিংবা ডিমের রোল—সবই সাদা কার্ডবোর্ডের বাক্সে পরিবেশিত খাবারকেই বোঝানো হয়। তবে যুক্তরাজ্যে এই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্রিটিশ চাইনিজ টেকআউট এমন এক স্বতন্ত্র খাদ্যসংস্কৃতি, যা যুক্তরাজ্যের বাইরে খুব কমই পরিচিত, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ঘিরে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

 

এই আগ্রহের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে টিকটক। “British Chinese food” লিখে খুঁজলেই হাজার হাজার ভিডিও দেখা যায়, যেখানে কেউ নিজেদের নিয়মিত টেকআউট দেখাচ্ছেন, আবার কেউ প্রথমবার এই খাবার চেখে দেখার অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। বিশেষ করে আমেরিকান দর্শকদের মধ্যে বিস্ময় ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ খাবারের রং নিয়ে ঠাট্টা করছেন, কেউ আবার একে অচেনা ও অস্বস্তিকর বলছেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশরা গর্বের সঙ্গে তাদের প্রিয় কমফোর্ট ফুডের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে চাউ মেইনের সঙ্গে কারি সস, কিংবা চাইনিজ খাবারের সঙ্গে চিপস পরিবেশনের মতো বিষয়গুলো। অনেক আমেরিকান প্রশ্ন তুলছেন—চাইনিজ রান্নায় ফ্রাই আর কারির জায়গা কোথায়? এই প্রশ্নই ব্রিটিশ চাইনিজ খাবারের ইতিহাস ও বিবর্তনের দিকে নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

যুক্তরাজ্যে প্রথম চাইনিজ রেস্টুরেন্ট চালু হয় ১৯০৮ সালে, লন্ডনে। প্রাথমিকভাবে মেনুতে ক্যান্টনিজ প্রভাবিত কিছু খাবার ছিল—ফ্রাইড রাইস, সুইট অ্যান্ড সাওয়ার পর্ক, চাউ মেইন ও চপ সুইয়ের মতো পদ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই রান্না ক্যান্টনিজ শিকড় বজায় রেখেই স্থানীয় স্বাদ ও উপকরণের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। এর ফলেই গড়ে ওঠে প্যানকেকের সঙ্গে ক্রিসপি ডাক, ক্রিসপি চিলি বিফ, সুইট অ্যান্ড সাওয়ার চিকেন বলস, সেসামি প্রন টোস্টের মতো এখনকার পরিচিত ব্রিটিশ চাইনিজ খাবার।

এই অভিযোজনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে ধরা হয় চিপসের ব্যবহার। ব্রিটিশ খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এই মোটা কাটের ফ্রাই চাইনিজ টেকআউটেও জায়গা করে নেয়। ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় চাইনিজ রেস্টুরেন্ট Sweet Mandarin-এর তৃতীয় প্রজন্মের মালিক হেলেন সে জানান, সল্ট অ্যান্ড পেপার চিপস, কারি সস ও এগ ফ্রাইড রাইসের সংমিশ্রণই এই বিবর্তনের সবচেয়ে শক্ত উদাহরণ।

যুক্তরাষ্ট্রে যেসব চাইনিজ খাবার জনপ্রিয়, তার অনেকগুলোই ব্রিটিশ মেনুতে নেই। জেনারেল সো’স চিকেন বা ক্র্যাব র‍্যাঙ্গুন সেখানে প্রায় অচেনা। আবার যুক্তরাজ্যে জনপ্রিয় ক্রিসপি সিওয়িড বা চিকেন সাতে আমেরিকানদের কাছে তেমন পরিচিত নয়। কিছু শহরের আবার নিজস্ব বিশেষ পদ রয়েছে—লন্ডনের জার জাও কিংবা আয়ারিশ চাইনিজ খাবার থেকে আসা স্পাইস ব্যাগ, যা এখন যুক্তরাজ্যজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

এই খাবারের পেছনের ইতিহাস শুধু স্বাদের গল্প নয়, বরং অভিবাসী জীবনেরও প্রতিচ্ছবি। হেলেন সের দাদি লিলি কওক, যিনি ১৯৫০ সালে চীন থেকে ইংল্যান্ডে আসেন, পথিমধ্যে সিঙ্গাপুর ও ভারত থেকে বিভিন্ন কারি ও মসলার ধারণা নেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তৈরি করেন নারকেলভিত্তিক, হালকা ঝাল ও ঘন কারি সস, যা পরে ব্রিটিশ চাইনিজ খাবারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

ম্যানচেস্টারে তার খোলা রেস্টুরেন্ট ও টেকআউটে চিপস ও কারিই ছিল প্রধান আকর্ষণ।
১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাজ্যে প্রায় ৭ হাজার চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ও টেকআউট ছিল, যেখানে ম্যাকডোনাল্ডসের সংখ্যা ছিল মাত্র ২০০।

আজও চাইনিজ খাবার ব্রিটেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় টেকআউটগুলোর একটি হলেও, এই কমিউনিটির ইতিহাস ও অবদান অনেকটাই আড়ালে থেকে গেছে।
লন্ডনের সিটি সেন্ট জর্জ’স বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার ডায়ানা ইয়ে মনে করেন, টিকটকে এই নতুন আগ্রহ আসলে ব্রিটিশ সমাজে চাইনিজ কমিউনিটির অবদান নতুন করে চিনে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

তার ভাষায়, এই আন্তঃজড়িত ইতিহাসগুলোই ব্রিটিশ সমাজকে সমৃদ্ধ করেছে। এমন এক সময়ে, যখন অভিবাসনবিরোধী মনোভাব বাড়ছে, তখন এই স্বীকৃতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

হেলেন সে বলেন, পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে। আর সেই ভিন্ন স্বাদের মধ্য দিয়েই ব্রিটিশ চাইনিজ খাবার আজ শুধু একটি টেকআউট নয়, বরং যুক্তরাজ্যের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া / সিএনএন ওয়ার্ল্ড

এম.কে

আরো পড়ুন

দেশে ৯ মাসে ১৫৪ সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার, গুলিতে নিহত ১

অনলাইন ডেস্ক

দইয়ের সঙ্গে যেসব খাবার খেতে মানা

অনলাইন ডেস্ক

পাবলিক ফান্ড ব্যবহারের শর্ত পরিবর্তন বা অপসারণের আবেদন কীভাবে করবেন?

নিউজ ডেস্ক