রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যেই ব্রিটেনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বর্তমান মজুত দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে মাত্র এক সপ্তাহের যুদ্ধ চালানোর মতো ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে ব্রিটেনের। একই সঙ্গে সেনাসংখ্যা, যুদ্ধজাহাজ, আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতির বিষয়ও সামনে এসেছে।
ব্রিটিশ সামরিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বর্তমানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হাতে প্রায় ছয় হাজার ড্রোন রয়েছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন ব্যবহারের যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাতে এই সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
ইউক্রেন বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় নয় হাজার ড্রোন ব্যবহার করছে বলে ধারণা করা হয়। একই সময়ে কিয়েভের দাবি, তারা প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার রুশ ড্রোন ধ্বংস করছে। এই বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত শুরু হলে ব্রিটেনকেও প্রতিদিন শত শত ড্রোন ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু বর্তমান সক্ষমতায় সেই মজুত কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতে পারে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হলে বা শান্তিচুক্তি হলে দশকের শেষ নাগাদ রাশিয়া ইউরোপে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর অবস্থানে পৌঁছে যেতে পারে। আর সেই সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় যুক্তরাজ্য।
সম্প্রতি লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারের নিচে পরিত্যক্ত আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনে ন্যাটোর একটি গোপন সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়।
‘এক্সারসাইজ আর্কেড স্ট্রাইক’ নামের এই মহড়ায় ২০৩০ সালে রাশিয়ার এস্তোনিয়া আক্রমণের একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি অনুশীলন করা হয়। এতে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইতালির সেনারা অংশ নেন।
যুক্তরাজ্য নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর ‘অ্যালাইড র্যাপিড রিঅ্যাকশন কর্পস’-এর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইক এলভিস বলেন, ২০৩০ সালেই রাশিয়া থেকে আসা হুমকি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “সঠিক বিনিয়োগ ও যুদ্ধকালীন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি না করা হলে ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে।”
ন্যাটোর স্থলবাহিনীর প্রধান ও ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল ক্রিস্টোফার ডোনাহুও একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছেন। তার মতে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি এখন ন্যাটোর জন্য জরুরি বাস্তবতা।
এই মহড়ায় ভূগর্ভস্থ কমান্ড পোস্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ড্রোনভিত্তিক যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল অনুশীলন করা হয়। ইউক্রেন যুদ্ধে দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিজ্ঞতার কারণে এখন সামরিক সদর দপ্তরগুলো মাটির নিচে স্থাপন করার প্রবণতা বাড়ছে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি দাবি করেছেন, সরকার ন্যাটোকেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা কৌশল বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীকে আধুনিক করছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, দেশটির সামরিক সক্ষমতা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় পৌঁছেছে।
বর্তমানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে পূর্ণ প্রস্তুত ও প্রশিক্ষিত সক্রিয় সেনার সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার, যা গত দুই শতকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে কার্যকর যুদ্ধজাহাজের সংখ্যাও কমে এসেছে। ব্রিটেনের ছয়টি ডেস্ট্রয়ারের মধ্যে চারটি বর্তমানে মেরামত বা সংস্কারে বন্দরে রয়েছে। কার্যকর ফ্রিগেট যুদ্ধজাহাজ রয়েছে মাত্র পাঁচটি।
সম্প্রতি সাইপ্রাসে ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার পর যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনে সরকারের ধীরগতিও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। হামলার তিন সপ্তাহ পর ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস ড্রাগন পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পৌঁছায়।
ব্রিটিশ সামরিক শক্তির এই দুর্বলতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও কটাক্ষ করেছেন। তিনি ব্রিটেনের বিমানবাহী রণতরীগুলো নিয়েও প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করেন।
এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপ বাড়ছে। সাবেক ন্যাটো মহাসচিব লর্ড জর্জ রবার্টসন সরকারকে “বিপজ্জনক আত্মতুষ্টি”র অভিযোগে অভিযুক্ত করে বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ব্রিটেন হুমকিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।
জানা গেছে, প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত ১ হাজার ৮০০ কোটি পাউন্ড বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি এখন সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। তবে আগামী এক দশকের সামরিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আর সেই বাস্তবতায় ব্রিটেনের সামরিক দুর্বলতা এখন শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

