যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন ওষুধ ও বাণিজ্য চুক্তিকে ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদল গবেষকের বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, চুক্তির ফলে আগামী এক দশকে ইংল্যান্ডের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হলে প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে, যা অন্যথায় এড়ানো সম্ভব ছিল।
বুধবার প্রকাশিত দ্য ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল (বিএমজে)-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে এ আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক, ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুল এবং নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ হাসপাতালের গবেষকেরা।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় যুক্তরাজ্য আগামী ১০ বছরে নতুন ওষুধের পেছনে ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে কমপক্ষে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করতে সম্মত হয়। এই পদক্ষেপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শাস্তিমূলক শুল্ক এড়ানোর বৃহত্তর বাণিজ্য চুক্তির অংশ।
চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র আগামী তিন বছরের জন্য ব্রিটিশ ওষুধ ও চিকিৎসা-সরঞ্জাম রপ্তানির ওপর নতুন কোনো শুল্ক আরোপ করবে না। এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া কিছু ওষুধের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, নতুন ওষুধের ব্যয় মেটাতে ২০৩৬ সালের শেষ নাগাদ যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসকে (এনএইচএস) অতিরিক্ত প্রায় ৪৫ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করতে হতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাজেট সীমিত হওয়ায় নতুন ওষুধে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হলে স্বাস্থ্যসেবার অন্য খাতগুলোতে বরাদ্দ কমে যেতে পারে। সরকার যদি অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ না দেয়, তাহলে চিকিৎসা সেবায় ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং এর ফলে প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষকদের মতে, সম্ভাব্য এই মৃত্যুর বড় অংশ হৃদরোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, পরিপাকতন্ত্রের রোগ এবং ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ঘটতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে যুক্তরাজ্য সরকার এই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত নয়। দেশটির স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা বিভাগ জানিয়েছে, অতিরিক্ত ৪৫ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ের হিসাব তারা গ্রহণ করছে না। সরকারের দাবি, ২০২৫ সালের ব্যয় পর্যালোচনায় প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতের অর্থায়ন পরবর্তী ব্যয় পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
সরকার আরও বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই অংশীদারত্বের ফলে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, যার মাধ্যমে এনএইচএসের রোগীরা আগে যেসব জীবনরক্ষাকারী নতুন ওষুধের সুযোগ পেতেন না, সেগুলো এখন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে গবেষকেরা চুক্তির আর্থিক সুফল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, যুক্তরাজ্য এখনও ওষুধের ক্ষেত্রে নিট আমদানিকারক দেশ। ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ দেশীয় অর্থনীতিতে না থেকে বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যাবে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ২০৩১ সালের মধ্যে এই চুক্তির সম্ভাব্য ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক ওষুধ রপ্তানির মোট মূল্যের চেয়েও বেশি হতে পারে।
সব মিলিয়ে নতুন এই ওষুধ চুক্তিকে ঘিরে একদিকে সরকার সম্ভাব্য স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন ও বিনিয়োগের সুযোগ দেখছে, অন্যদিকে গবেষকেরা সতর্ক করছেন যে অতিরিক্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা না হলে এনএইচএসের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবায় চাপ বাড়তে পারে এবং এর প্রভাব রোগীদের জীবন ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুতরভাবে পড়তে পারে।
সূত্রঃ সিএনএন
এম.কে

