27 C
London
June 16, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

অভিবাসীদের জন্য যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণ-নির্বাসন পরিকল্পনা ঘোষণা

যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘রিফর্ম ইউকে’ ক্ষমতায় এলে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভিবাসী প্রত্যাবাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। দলটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় ছয় লাখ অবৈধ অভিবাসীকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে।

দলটির চেয়ারম্যান জিয়া ইউসুফ যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, যুক্তরাজ্যকে “অবৈধ অভিবাসনের সংকট” থেকে রক্ষা করতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি দাবি করেন, রিফর্ম ইউকে সরকার গঠন করতে পারলে ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বহিষ্কার অভিযান শুরু করা হবে।

‘অপারেশন রিস্টোরিং জাস্টিস’ নামে ঘোষিত এই পরিকল্পনার আওতায় যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে বসবাসরত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আটক এবং পর্যায়ক্রমে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জিয়া ইউসুফের দাবি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ অবৈধভাবে বসবাস করছেন। যদিও এই সংখ্যাটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক রয়েছে।

রিফর্ম ইউকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় এলে তারা ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ থেকে যুক্তরাজ্যকে প্রত্যাহার, মানবাধিকার আইন বাতিল এবং শরণার্থী সনদের কিছু বিধান অকার্যকর করার উদ্যোগ নেবে। দলটির ভাষ্য, এসব আইনি কাঠামো অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, যারা অবৈধ উপায়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করবেন, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আশ্রয় প্রার্থনার সুযোগ হারাবেন এবং বহিষ্কারের আগ পর্যন্ত অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটক থাকতে পারেন।

এছাড়া দলটি ‘অনির্দিষ্টকালের বসবাসের অনুমতি’ ব্যবস্থাও বাতিল করতে চায়। সরকারি ভাতা গ্রহণকারী, সামাজিক আবাসনে বসবাসকারী অথবা আর্থিকভাবে স্বনির্ভর নন— এমন ব্যক্তিদের ভিসা পুনর্বিবেচনার প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।

রিফর্ম ইউকের পরিকল্পনায় একটি বিশেষ ‘প্রত্যাবাসন কমান্ড’ গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এই সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা, কর বিভাগ, যানবাহন নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ এবং ব্যাংকিং তথ্য ব্যবহার করে সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করবে।

শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আটক কেন্দ্রে রাখা হবে। বর্তমানে যেখানে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে নতুন পরিকল্পনায় একসঙ্গে ২৪ হাজার ব্যক্তিকে আটকে রাখার সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রিফর্ম ইউকের নেতারা জানিয়েছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত নির্মাণযোগ্য অবকাঠামো ব্যবহার করে এসব আটক কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে প্রতিদিন সর্বোচ্চ পাঁচটি বিশেষ উড়োজাহাজের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিশ্চিত করা।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আটক কেন্দ্র পরিচালনা, আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন, নিরাপত্তা তদারকি এবং ভিসা প্রক্রিয়াকরণের কাজ করে থাকে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই সম্ভাব্য নতুন সরকারের এই নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

কিছু প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা রাজনৈতিক বিষয়ে মন্তব্য করে না। অন্যরা বিষয়টিকে “অনুমাননির্ভর প্রস্তাব” হিসেবে উল্লেখ করে কোনো অবস্থান প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছে।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, এমন নীতি বাস্তবায়িত হলে নাগরিক স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। তাদের মতে, ব্যাপক নজরদারি, অনির্দিষ্টকালের আটক এবং গণ-প্রত্যাবাসন নিয়ে গুরুতর নৈতিক ও আইনি বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, রিফর্ম ইউকের সমর্থকদের দাবি, যুক্তরাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে অভিবাসন ইস্যুই যুক্তরাজ্যের অন্যতম প্রধান বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হতে যাচ্ছে। তবে রিফর্ম ইউকে ক্ষমতায় এলেও তাদের ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে আইনি বাধা, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যেসব ব্যক্তি বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন, তাদের জন্য ভবিষ্যতের নীতিগত পরিবর্তনগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিবাসন আইন ও নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন এলে তা সরাসরি তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে আবাসনের জন্য যুদ্ধঃ ব্রিস্টলে গৃহহীনতার চাপে গড়ে উঠছে চলমান জনপদ

যুক্তরাজ্যে বাড়ির দাম কমার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ

লন্ডনে হৃদয়বিদারক দৃশ্যঃ কার্নিশে আটকে থাকা শিশুকে ঘিরে আতঙ্ক

নিউজ ডেস্ক