TV3 BANGLA
বাংলাদেশযুক্তরাজ্য (UK)

নাগরিকত্ব ত্যাগ না করেই নির্বাচনঃ সাংবিধানিক সংকটে প্রবাসী প্রার্থীরা

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী একাধিক প্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং তা ত্যাগের প্রক্রিয়া নিয়ে দেশ ও প্রবাসে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নাগরিকত্ব ত্যাগের চূড়ান্ত সনদ সংগ্রহ না করেই অনেক প্রার্থী কেবল ‘আবেদন প্রক্রিয়াধীন’ উল্লেখ করে আইনজীবীর প্যাডে চিঠি জমা দিয়ে মনোনয়নপত্র বৈধ করার চেষ্টা করছেন। অথচ প্রচলিত নির্বাচন আইন ও সংবিধান অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের দাপ্তরিক প্রমাণপত্র ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই।

 

বিএনপির ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামান, ড. মনিরুজ্জামান, এম এ মালিক, কয়ছর এম আহমদ, ফয়সল চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামীর ব্যারিস্টার নজরুল ইসলামসহ একাধিক প্রবাসী ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী ইতোমধ্যে নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় হয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে কেবল সুনামগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী কয়ছর এম আহমদের নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ত্যাগ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা ও আইনি প্রশ্ন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২(গ) দফায় স্পষ্টভাবে বলা আছে—কোনও ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক হলে বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য নন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন জমা দেওয়া বা তার রিসিভ কপি এই সাংবিধানিক বাধা দূর করে না। বিদেশি সরকারের ইস্যুকৃত চূড়ান্ত ‘ত্যাগপত্র’ বা সার্টিফিকেটই একমাত্র বৈধ প্রমাণ।

সিলেট-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী এম এ মালিকের মনোনয়নপত্র স্থগিত হওয়ার পর তিনি একাধিকবার গণমাধ্যমে দাবি করেছেন যে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। তবে তার দাবির পক্ষে চূড়ান্ত কোনো দাপ্তরিক সনদ প্রকাশ্যে আসেনি। লক্ষণীয় যে, ওই আসনে বিএনপি বিকল্প কোনো প্রার্থীও দেয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

অন্যদিকে, দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুল আলম (সালেহী) এবং চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে ডা. এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। ডা. ফজলুল হক হলফনামায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের দাবি করলেও এর পক্ষে কোনো নথি জমা দেননি। বাছাইয়ের সময় তিনি জানান, নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে শুনানি হবে। কিন্তু দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়, যদিও তিনি আপিলের সুযোগ পাচ্ছেন।

ব্রিটিশ ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট ১৯৮১-এর ১২ ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ একটি দীর্ঘ ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ‘ডিক্লারেশন অব রেনানসিয়েশন’ (ফর্ম RN) জমা দিতে হয় এবং এর জন্য ৪৮২ পাউন্ড ফি পরিশোধ করতে হয়। স্বরাষ্ট্র সচিবের দপ্তরে এই ঘোষণা নিবন্ধিত হওয়ার পরই কেবল নাগরিকত্ব কার্যকরভাবে শেষ হয়।

লন্ডনের আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার ইকবাল হোসেন জানান, আবেদন জমা দিলেই কেউ ব্রিটিশ নাগরিকত্ব হারান না। স্বাক্ষরিত ও সিলমোহরযুক্ত ‘ডিক্লারেশন অব রেনানসিয়েশন’ হাতে না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবেই বিবেচিত হন। এমনকি নাগরিকত্ব ত্যাগের পর আগের ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ (আইএলআর) মর্যাদাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসে না।

তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই রকম কঠোরতা রয়েছে। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের সেকশন ৩৪৯(এ) অনুযায়ী, নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হলে বিদেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কনস্যুলার অফিসারের সামনে শপথ নিতে হয়। প্রায় ২,৩৫০ ডলার ফি পরিশোধের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনে ‘সার্টিফিকেট অব লস অব ন্যাশনালিটি’ (CLN) ইস্যু হলে তবেই নাগরিকত্ব বিলুপ্ত হয়।

এমন বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লন্ডনের কিংডম সলিসিটরসের কর্ণধার ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী। তার ভাষায়, চূড়ান্ত নাগরিকত্ব ত্যাগের সনদের পরিবর্তে কেবল আবেদনের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র গ্রহণ করা হচ্ছে, যা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের দপ্তরগুলো যাচাই ছাড়াই মেনে নিচ্ছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “নমিনেশন বৈধ হওয়ার পর কেউ চাইলে নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন প্রত্যাহার করতে পারেন। তখন তিনি বিদেশি নাগরিকই থেকে যাবেন, অথচ নির্বাচন করবেন আবেদনের রসিদের সুযোগ নিয়ে। এটি সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। বিষয়টি উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে বহু প্রার্থীর প্রার্থিতাই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।”

দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে এই ফাঁকফোকর ও শিথিলতা নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক শুদ্ধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করছে, যা নির্বাচন কমিশনের জন্য এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন

এম.কে

আরো পড়ুন

হাদির জানাজা ঘিরে যুক্তরাজ্যের সতর্কতা

টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলের ১৪ মাদক ব্যবসায়ীর কারাদণ্ড

আইনি পর্যালোচনার আগেই প্রীতি প্যাটেলের পুশব্যাকনীতি প্রত্যাহার