28.6 C
London
May 23, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

নিট অভিবাসন কমলেও বিদেশি শ্রমিকের ওপর ব্রিটেনের নির্ভরতা রেকর্ড উচ্চতায়

ইইউ গণভোটের এক দশক পরও ব্রিটিশ অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে বিদেশি কর্মীদের গুরুত্ব কমেনি, বরং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেড়েছে। নতুন সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে যুক্তরাজ্যের মোট কর্মজীবী মানুষের মধ্যে ২২.৪ শতাংশ বিদেশে জন্মগ্রহণকারী—যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কোভিড-পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের আমলে চালু হওয়া অভিবাসন নীতির ফলেই এই বড় পরিবর্তন ঘটেছে।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস (ওএনএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মাত্র তিন বছরে নিট ২২ লাখ অভিবাসী ব্রিটেনে প্রবেশ করেন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এই সময়টি এখন ‘বরিসওয়েভ’ নামে পরিচিত। এই ঢলের কারণে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে গত ৭৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিত্র আবার দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর ব্রিটেনে নিট অভিবাসন নেমে এসেছে ১ লাখ ৭১ হাজারে, যা মহামারি সময় বাদ দিলে ২০১২ সালের পর সর্বনিম্ন। অথচ ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে এই সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৪৪ হাজার। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, চলতি বছর ব্রিটেনে নিট অভিবাসন ঋণাত্মক অবস্থায়ও যেতে পারে—যা তিন দশকের বেশি সময়ে প্রথম ঘটনা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ব্রিটিশ অর্থনীতির সামনে বড় ধরনের বাস্তবতা হাজির করছে। দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসনের মাধ্যমে শ্রমবাজারের ঘাটতি পূরণ, কর আদায় বৃদ্ধি এবং সরকারি অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার যে কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে, এখন সেই নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাইগ্রেশন অবজারভেটরি’র অর্থনীতিবিদ বেন ব্রিন্ডল বলেন, অভিবাসীরা শুধু খালি চাকরি পূরণ করেন না, বরং নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করেন। তার মতে, বেশি শ্রমিক পাওয়া গেলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ও সেবাখাতকে এমনভাবে সম্প্রসারণ করে যাতে অর্থনীতিতে সামগ্রিক কর্মসংস্থান বাড়ে।

ব্রিটিশ সরকারের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টাদের অনেকেই অভিবাসনকে “স্বল্পমেয়াদি আর্থিক স্বস্তির হাতিয়ার” হিসেবে দেখছেন। কারণ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লে কর আদায়ও বাড়ে এবং সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি আসে।

অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি (ওবিআর)-এর আগের হিসাব অনুযায়ী, নিট অভিবাসন ১ লাখ বাড়লে পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারি ঋণ প্রায় ৬.৬ বিলিয়ন পাউন্ড কমে যেতে পারে। অর্থাৎ কোভিড-পরবর্তী সময়ে অভিবাসনের ঢল না থাকলে ব্রিটিশ সরকারের ঋণের চাপ আরও অন্তত ৩০ বিলিয়ন পাউন্ড বেশি হতে পারত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, অভিবাসন অর্থনীতির সামগ্রিক আকার বাড়ালেও সাধারণ মানুষের মাথাপিছু আয় বা জীবনমান খুব বেশি বাড়ায় না। বরং স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন ও সামাজিক সেবার ওপর চাপও বাড়ে।

এদিকে অভিবাসন এখন ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, অর্থনীতির পর অভিবাসনই এখন ভোটারদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উদ্বেগের বিষয়। প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোটার এটিকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন।

টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ম্যাথিউ সিম মনে করেন, ভবিষ্যতে ব্রিটেনকে “সংখ্যাভিত্তিক” নয়, বরং “দক্ষতাভিত্তিক” অভিবাসন নীতির দিকে যেতে হবে। তার মতে, কম সংখ্যক হলেও উচ্চ দক্ষতার চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ, প্রকৌশলী ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের আনা ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্য বেশি উপকারী হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সব ধরনের অভিবাসী অর্থনীতিতে সমান অবদান রাখেন না। উচ্চ দক্ষতার পেশাজীবীরা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করলেও নিম্নবেতনের খাতে আসা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে সামাজিক সেবা ও কেয়ার খাতে কর্মরতদের বড় অংশ পরবর্তীতে অন্য খাতে চলে গেলে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।

কেয়ার সেক্টরের উদ্যোক্তারা বলছেন, কোভিডের পর বিদেশি কর্মীদের আগমন না ঘটলে ব্রিটেনের বহু কেয়ার হোম বন্ধ হয়ে যেত। তবে এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পাওয়ার পর এই কর্মীদের অনেকেই ভালো বেতনের চাকরিতে চলে যেতে পারেন।

এর মধ্যেই ব্রিটিশ সরকার গত বছর কেয়ার সেক্টরের জন্য নতুন ভিসা কার্যত বন্ধ করে দেয়, যা সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে ব্রেক্সিট-পরবর্তী নতুন অভিবাসন ব্যবস্থায় বিদেশি নাগরিকদের কর্মসংস্থান হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে অভিবাসীদের কর্মসংস্থান হার ৭৭.২ শতাংশ, যেখানে ব্রিটিশ নাগরিকদের গড় হার ৭৪.৪ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ওয়ার্ক ভিসাধারীরাই নয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, নির্ভরশীল পরিবারের সদস্য এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন থেকে আসা শরণার্থীরাও শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন।

একই সময়ে ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে কর্মবিমুখতা বাড়ছে। কোভিডের পর অসুস্থতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও সামাজিক ভাতার ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ায় প্রায় ৬ লাখ ব্রিটিশ শ্রমবাজার ছেড়েছেন। তরুণদের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ বর্তমানে না কাজ করছেন, না পড়াশোনা করছেন।

এদিকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী খাতের উদ্যোক্তারা অভিযোগ করছেন, বর্তমান ভিসা ব্যবস্থা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল ও ধীরগতির হওয়ায় উচ্চ দক্ষতার আন্তর্জাতিক কর্মী আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

কেমব্রিজশায়ারভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্যারাগ্রাফের মানবসম্পদ পরিচালক হেলেন ডাইটন বলেন, ভিসা অনুমোদনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা এবং উচ্চ বেতনসীমা অনেক প্রতিভাবান কর্মীকে যুক্তরাজ্যে আসতে নিরুৎসাহিত করছে।

তার মতে, অভিবাসন নিয়ে ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক রাজনৈতিক বক্তব্যও দক্ষ আন্তর্জাতিক কর্মীদের কাছে ব্রিটেনকে কম আকর্ষণীয় করে তুলছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ‘বরিসওয়েভ’-এর প্রভাব ব্রিটেনকে আরও বহু বছর বহন করতে হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার-এর সরকার কিংবা ভবিষ্যতের যেকোনো নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—কীভাবে অর্থনীতির প্রয়োজন, জনমতের চাপ এবং টেকসই অভিবাসন নীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা যায়।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

আয়ারল্যান্ডে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য কঠোর নিয়মঃ কাজ করলে আবাসন খরচ বহন বাধ্যতামূলক

লন্ডনে ভারতের হাইকমিশন হতে ভারতের পতাকা নামিয়ে নিল শিখদের একাংশ

নিরাপত্তা উদ্বেগে উত্তাল ব্রিটেনঃ অপরাধে জড়িত বিদেশিদের বহিষ্কারের আহ্বান জোরালো