নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি শত শত মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। নেপালের রাসুয়া এলাকায় বুধবার ভোরের এই দুর্যোগে অন্তত ৯৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই ঘটনায় চীনের তিব্বত অঞ্চলেও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির রাসুয়া এলাকায় মোট ৫৭৯ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৬৬ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিরা ২৮টি দেশের নাগরিক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নিখোঁজদের মধ্যে ৩৩ জন যুক্তরাজ্যের নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সরকার। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ব্রিটিশ নাগরিকদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে ‘উদ্বেগজনক প্রতিবেদন’ পাওয়ার পর তারা নেপালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
ব্রিটিশ নাগরিকদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার পাশাপাশি পরিস্থিতির পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। নেপালে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাসও অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে থাকা নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
নেপাল পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ১১৩ জন নেপালি এবং ৫৪ জন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। বাকিরা বিভিন্ন দেশের নাগরিক।
এদিকে ব্রিটিশ পর্যটকদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় একটি ভ্রমণ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নেপালে গাইডেড অভিযান ও পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনাকারী আলপাইন ইকো ট্রেক জানিয়েছে, তাদের পরিচালিত একটি ভ্রমণ দলে থাকা ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক ও দুইজন আইরিশ নাগরিক নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় গিয়েছিলেন। তাদেরও নিখোঁজ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক কুমার অধিকারী জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে তাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে বুধবার সকালে ওই ১২ ব্রিটিশ নাগরিকের সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করার কথা ছিল। প্রতিষ্ঠানটির ভ্রমণ নথি অনুযায়ী, নিখোঁজ ব্রিটিশ নাগরিকদের বয়স ১৩ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে।
দুর্যোগটি আঘাত হানে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ঠিক উত্তরে অবস্থিত রাসুয়া এলাকায়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, একটি ভূমিকম্পের পর তুষারধসের সৃষ্টি হয়। সেই তুষার গলে বিপুল পরিমাণ পানি ভোতে কোশি নদীতে নেমে আসার পর আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষও নেমে আসে। এতে সীমান্তবর্তী সড়ক, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
ঘটনার ভয়াবহতা ধরা পড়েছে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে। একটি সিসিটিভি ফুটেজে সীমান্ত পারাপারের একটি এলাকার ভবনগুলোর ওপর দিয়ে পানি ও কাদার বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়তে দেখা গেছে। অন্য একটি ভিডিওতে ত্রিশুলি এলাকায় কয়েক ডজন মানুষকে আকস্মিক বন্যার পানির ঢেউ থেকে বাঁচতে ছুটে পালাতে দেখা যায়।
শুধু নেপালেই নয়, সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিরং এলাকায় ভূমিধসে তিনজন নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে উদ্ধারকারী দল অভিযান চালাচ্ছে।
দুর্যোগের পর নেপাল ও চীন—উভয় দেশেই উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, আকস্মিক পানির প্রবাহ এবং ভূমিধসের কারণে উদ্ধারকাজে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই অঞ্চলটি পাহাড়ি ও দুর্গম হওয়ায় নিখোঁজ পর্যটকদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং তাদের কাছে দ্রুত পৌঁছানো উদ্ধারকারী দলের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা এবং নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ নাগরিকদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি যুক্তরাজ্য সরকারের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে কিশোর থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক পর্যটক রয়েছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা এখন স্বজনদের কোনো খবরের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সব মিলিয়ে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে। এখন পর্যন্ত নেপালে অন্তত ৯৫ জন এবং তিব্বতে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে শত শত মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ওই অঞ্চলে থাকা পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি\ এপি

