যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী সোমবার থেকে যেসব আশ্রয়প্রার্থী শরণার্থী মর্যাদা পাবেন, তাদের কেবল অস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্তকে এক প্রজন্মের মধ্যে যুক্তরাজ্যের আশ্রয় ব্যবস্থায় অন্যতম বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, শরণার্থীদের অবস্থা প্রতি ৩০ মাস অন্তর পর্যালোচনা করা হবে। সংশ্লিষ্ট দেশকে নিরাপদ বিবেচনা করা হলে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে। তবে অভিভাবকবিহীন শিশুদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। সরকার জানিয়েছে, এ পরিবর্তন কার্যকর করতে পার্লামেন্টে ভোটের প্রয়োজন নেই, কারণ এটি বিদ্যমান বিধিমালার সংশোধনের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হচ্ছে।
স্থায়ী বসবাসের অধিকার পাওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ অভিবাসী পাঁচ বছরে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেলেও তা বাড়িয়ে ১০ বছর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শরণার্থীদের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। তবে এসব প্রস্তাব আইনে রূপ দিতে পূর্ণাঙ্গ পার্লামেন্টারি প্রক্রিয়া প্রয়োজন হবে, ফলে তা বছরের শেষের আগে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সম্প্রতি ডেনমার্ক সফরে গিয়ে মাহমুদ সে দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করেন। রাজধানী কোপেনহেগেন-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকার শরণার্থী মর্যাদার ধারণাকে স্থায়ী থেকে অস্থায়ী ব্যবস্থায় রূপান্তর করছে। তার ভাষ্য, এতে অবৈধভাবে নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে আসার আগ্রহ কমবে এবং সীমান্ত ব্যবস্থার ওপর জনআস্থা পুনরুদ্ধার হবে।
ডেনমার্কের শাসক দল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণ করে ডানপন্থী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে—এ উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি। সেখানে শরণার্থীদের অন্তত প্রতি দুই বছর পরপর পর্যালোচনা করা হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ডেনমার্কের জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বাস্তবতা যুক্তরাজ্যের তুলনায় ভিন্ন; বিশেষ করে ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার মতো চ্যালেঞ্জ সেখানে নেই।
২০২৫ সালে মোট ৪১ হাজার ৪৭২ জন অভিবাসী ছোট নৌকায় করে চ্যানেল অতিক্রম করে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ হাজার বেশি। বিরোধী দলগুলোর দাবি, ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশন থেকে না বের হলে এ প্রবণতা বন্ধ করা যাবে না। তবে মাহমুদ স্পষ্ট করেছেন, তিনি কনভেনশন ত্যাগ করবেন না; বরং এর ব্যাখ্যায় পরিবর্তন আনার পথ খুঁজছেন, যাতে আরও বেশি আশ্রয়প্রার্থীকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়।
নিজ দলের ভেতর থেকেও সমালোচনা উঠেছে। প্রায় ৪০ জন লেবার সংসদ সদস্য স্থায়ী বসবাসের নিয়ম পরিবর্তনের প্রস্তাবকে “অ-ব্রিটিশ” ও “খেলার নিয়ম বদলে দেওয়া” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এতে দক্ষ জনবল সংকট—বিশেষ করে পরিচর্যা খাতে—আরও তীব্র হতে পারে। গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কি অভিযোগ করেছেন, লেবার অভিবাসন ইস্যুতে চরম ডানপন্থীদের ভাষ্য অনুসরণ করছে।
শরণার্থী সহায়তাকারী দাতব্য সংস্থা রিফিউজি কাউন্সিল-এর প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন, সফল শরণার্থীদের মর্যাদা বারবার পর্যালোচনা করা ব্যয়বহুল হবে এবং এতে তাদের কর্মসংস্থান ও সমাজে একীভূত হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তাদের মতে, যদি শরণার্থীরা অনিশ্চয়তায় থাকেন, তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণও বাধাগ্রস্ত হবে।
ডেনমার্ক সফরে মাহমুদ রাজধানী থেকে প্রায় ১৬ মাইল দূরের একটি গ্রহণকেন্দ্রে ডরমিটরি ধাঁচের আবাসন পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, যুক্তরাজ্যেও আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেল থেকে সরিয়ে অনুরূপ মৌলিক আবাসনে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে নির্বাচনী ক্ষতির ঝুঁকিও তিনি স্বীকার করেছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ভাষায়, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা জনআস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসন কমানো কঠিন হলেও সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। চলতি সপ্তাহেই তিনি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পক্ষে “প্রগতিশীল যুক্তি” তুলে ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

