9.2 C
London
May 13, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

পোশাক রফতানিতে আবারও চীনকে পেছনে ফেললো বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাক বাজারে আবারও চীনকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। পাল্টা শুল্ক, বাণিজ্যযুদ্ধ ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রভাবে মার্কিন বাজারে চীনের পোশাক রফতানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সেই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করছে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ২০৪ কোটি ডলারের। একই সময়ে চীনের রফতানি নেমে এসেছে ১৭০ কোটি ডলারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রফতানিতে আবারও চীনকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ।

যদিও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে বাংলাদেশের রফতানি আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমেছে, তবু চীনের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান অনেক বেশি স্থিতিশীল রয়েছে। একই সময়ে চীনের রফতানি কমেছে প্রায় ৫৩ শতাংশ।

অটেক্সার তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তৈরি পোশাক আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৭৩ কোটি ডলারে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

পরিমাণের দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক আমদানি কমেছে ১২ দশমিক ২৮ শতাংশ। তবে উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে গড় ইউনিট মূল্য সামান্য বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচন, অতিরিক্ত মজুত এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে মার্কিন বাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক রফতানিকারক দেশ চীন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় চাপের মুখে রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটির পোশাক রফতানি কমেছে ৫২ দশমিক ৯১ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে যেখানে চীন ৩৬১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছিল, এবার তা নেমে এসেছে ১৭০ কোটি ডলারে।

শুধু রফতানি মূল্য নয়, পরিমাণের দিক থেকেও বড় ধস নেমেছে। চীনের রফতানির পরিমাণ কমেছে ৪০ দশমিক ১৫ শতাংশ। একই সঙ্গে ইউনিট মূল্যও কমেছে ২১ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা, উচ্চ শুল্কহার এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর বিকল্প সোর্সিং কৌশলের কারণে চীনের ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের বাজার হিস্যা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। কম দামে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং শক্তিশালী ডেনিম ও নিটওয়্যার খাতের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিক আমদানি ১১ শতাংশের বেশি কমলেও বাংলাদেশের পতন তুলনামূলক কম হওয়া ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এতে বোঝা যায়, বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশ তার অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

বিশেষ করে চীনের বিকল্প হিসেবে এখন অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছে।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে বৈশ্বিক পোশাক আমদানিতে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা গেছে। সামগ্রিকভাবে আমদানি কমলেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। বিশেষ করে চীনের রফতানিতে বড় পতন হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “এ সময়ে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া ভালো প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। অপরদিকে ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার রফতানিতেও চাপ ছিল। বাংলাদেশের রফতানি কিছুটা কমলেও পরিমাণ ও দামের দিক থেকে দেশটি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে আছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এখনও শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে দেশটি ৩৯৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারের প্রায় ২২ শতাংশ হিস্যা ভিয়েতনামের দখলে। অপরদিকে বাংলাদেশের দখলে রয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ বাজার।

অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ভারতের রফতানি কমেছে ২৭ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি ১১০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে।

অপরদিকে কম্বোডিয়া উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। দেশটির রফতানি বেড়েছে ১৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার রফতানি প্রায় স্থিতিশীল থাকলেও দেশটি কম দামে বেশি পণ্য রফতানি করে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের ইউনিট মূল্য কমেছে ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ বাজার ধরে রাখতে তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়েছে।

একই পরিস্থিতির মুখে রয়েছে ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা চলছে বলে জানিয়েছেন রফতানিকারকরা। তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ক্রেতারা কম দামে পণ্য কিনতে চাইছেন। ফলে কম মুনাফায় অর্ডার নিতে হচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠানকে।

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম তন্তুর পোশাকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বন্দর, জ্বালানি ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখন শুধু বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী দেশে পরিণত হচ্ছে।

সূত্রঃ অটেক্সা

এম.কে

আরো পড়ুন

পদ্মায় ভরা মৌসুমেও ধরা পড়ছে না ইলিশ

বিনিয়োগ সম্মেলন এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কাঁদলেন ড. ইউনূস

পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো নিয়ে আলোচনা