TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

‘ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েল কর্তৃক আইনি বর্ণবৈষম্যের শিকার’: যুক্তরাজ্যের নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সদ্য গঠিত সরকারের নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উমা কুমারানের অতীতের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তিনি পার্লামেন্টের একটি কমিটির শুনানিতে দাবি করেছিলেন, ফিলিস্তিনিরা “আইনি বর্ণবৈষম্যের” শিকার। তার এই বক্তব্যকে সমালোচকরা ‘উসকানিমূলক’ ও ‘ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

বার্নহাম সরকারের মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের পর উমা কুমারানকে পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী করা হলেও তিনি মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দায়িত্ব পাবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর। তবে তার অতীতের মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত ৭ জুলাই ফরেন অ্যাফেয়ার্স সিলেক্ট কমিটির বৈঠকে পূর্ব লন্ডনের বো অ্যান্ড স্ট্র্যাটফোর্ড আসনের লেবার এমপি উমা কুমারান উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক ডা. হুসাম আবু সাফিয়ার আটক থাকার বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হামিশ ফ্যালকনারকে প্রশ্ন করেন। ইসরায়েল ২০২৪ সালের শেষ দিকে ডা. আবু সাফিয়াকে গ্রেপ্তার করে এবং অভিযোগ করে যে তিনি হামাসের একজন সন্ত্রাসী অপারেটিভ।

কমিটির শুনানিতে কুমারান বলেন, ডা. আবু সাফিয়া দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই আটক রয়েছেন এবং জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী গাজার চিকিৎসকদের আটক ও নির্যাতন স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংসের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কিছু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে “মেডিসাইড” বলে অভিহিত করছেন, যা গণহত্যার একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।

শুনানির এক পর্যায়ে উমা কুমারান দাবি করেন, ফিলিস্তিনিরা “আইনি বর্ণবৈষম্যের একটি ব্যবস্থার” মধ্যে বসবাস করছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (ICRC) ইসরায়েলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দেখা করতে না পারায় বন্দিদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করছে কি না।

জবাবে তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হামিশ ফ্যালকনার ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে—এমন সরাসরি মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য সরকার দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের কাছে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে আসছে এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রসকে আটক ব্যক্তিদের কাছে প্রবেশাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও বারবার উত্থাপন করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের কাছে কিছু অস্ত্র রপ্তানিতে আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পেছনে সরকারের মূল্যায়ন ছিল যে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের একটি “বাস্তব ঝুঁকি” বিদ্যমান ছিল।

পরদিন উমা কুমারান নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ওই শুনানির ভিডিও প্রকাশ করে একই অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, তিনি আগেই সরকারের কাছে ইসরায়েলের মৃত্যুদণ্ড আইন এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান “আইনি বর্ণবৈষম্য” নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মানবিক আইন স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করছে।

তার এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। লেবার পার্টির একজন এমপি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য জিউইশ ক্রনিকল-কে বলেন, পশ্চিম তীর ও গাজার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে “অ্যাপারথাইড” ও “গণহত্যা”-র মতো শব্দ ব্যবহার করা বাস্তব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তার দাবি, এ ধরনের ভাষা উসকানিমূলক এবং তথ্যভিত্তিক নয়।

এদিকে ব্রিটেনের ইহুদি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনও বার্নহাম সরকারের ইসরায়েল-সংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বোর্ড অব ডেপুটিজ এবং জিউইশ লিডারশিপ কাউন্সিল বলেছে, গাজা যুদ্ধ নিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য তাদের মধ্যে “গুরুতর উদ্বেগ” সৃষ্টি করেছে।

যদিও প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম নিজে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনেননি, তবে তার সরকারের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্য অতীতে ইসরায়েলের সমালোচনায় কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

পররাষ্ট্র দপ্তর এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি উমা কুমারান মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দায়িত্ব পাবেন কি না। তবে তার অতীতের বক্তব্যকে ঘিরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সূত্রঃ দ্য জিউইশ ক্রনিকল

এম.কে

আরো পড়ুন

‘ভুল বাক্সে টিক দেয়ায় আমার স্ত্রীর লিভ টু রিমেইন রিফিউজ হয়ে গেছে’

যুক্তরাজ্যে বর্ডার ফোর্স কর্তৃক ম্যানচেস্টার বিমানবন্দরে গ্রেফতারের পর এক ব্যক্তির মৃত্যু

লন্ডনের পরিবহন ব্যবস্থায় সংকটের আশঙ্কা, স্কিল্ড ভিসা নীতিতে ক্ষুব্ধ TfL ও ইউনিয়নগুলো