ব্রিটেনে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে থাকা ঐতিহাসিক বিধিনিষেধ দূর করতে পার্লামেন্টে নতুন বিল উত্থাপন করেছে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকার। ১৫ সেপ্টেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে চার্চ অ্যাপয়েন্টমেন্টস (রিপিল অব ডিসক্রিমিনেটরি প্রভিশন) বিল পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হয়।
প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে এমন পুরোনো বিধান বাতিল করা হবে, যার কারণে কোনো রোমান ক্যাথলিক বা ইহুদি প্রধানমন্ত্রী চার্চ অব ইংল্যান্ডের নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে রাজাকে আনুষ্ঠানিক পরামর্শ দেওয়ার সাংবিধানিক দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে পারেন না। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন আইন কার্যকর হলে বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব প্রধানমন্ত্রী তাদের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস নির্বিশেষে প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
ব্রিটেনের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী রাজা বা রানির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চার্চ অব ইংল্যান্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ দেওয়ার ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বহাল থাকা কিছু আইনি বিধানের কারণে রোমান ক্যাথলিক ও ইহুদি ধর্মাবলম্বী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধতা ছিল।
এই বিধিনিষেধের ঐতিহাসিক সূত্র রয়েছে ১৮২৯ সালের রোমান ক্যাথলিক রিলিফ অ্যাক্ট এবং ১৮৫৮ সালের জিউজ রিলিফ অ্যাক্ট-এর সময়কার আইনি ব্যবস্থায়। ওই সময় ক্যাথলিক ও ইহুদিদের সরকারি পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বহু পুরোনো বাধা তুলে দেওয়া হলেও চার্চ অব ইংল্যান্ডের নিয়োগের বিষয়ে রাজা বা কিং’কে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধান বহাল রাখা হয়েছিল। নতুন বিলের মাধ্যমে সেই অবশিষ্ট বিধানও বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এতদিন এই বিধিনিষেধের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়নি, কারণ এর আগে কোনো রোমান ক্যাথলিক বা ইহুদি প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেননি। তবে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিষয়টি সরাসরি সাংবিধানিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী যেন তার সাংবিধানিক দায়িত্বের কোনো অংশ থেকে বাদ না পড়েন, সেটিই নতুন বিলের মূল উদ্দেশ্য।
সরকার বলেছে, বিলটি সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট পরিসরের। এর মাধ্যমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং ভবিষ্যতে দায়িত্ব নেওয়া যেকোনো রোমান ক্যাথলিক বা ইহুদি প্রধানমন্ত্রী চার্চ অব ইংল্যান্ডের নিয়োগের বিষয়ে রাজাকে পরামর্শ দেওয়ার পূর্ণ অধিকার পাবেন।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের ফলে প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় আর বাধা হিসেবে থাকবে না। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইনটি আধুনিকায়নের মাধ্যমে সব প্রধানমন্ত্রীর জন্য একই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
নতুন আইন কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত চার্চ অব ইংল্যান্ডের নিয়োগসংক্রান্ত দায়িত্ব লর্ড চ্যান্সেলর-এর কাছে হস্তান্তর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এর ফলে নতুন আইন কার্যকর হওয়ার মধ্যবর্তী সময়েও চার্চের নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
ব্রিটেনের রিলিজিয়ন মিডিয়া সেন্টার জানিয়েছে, বিলটি আনার আগে বার্নহ্যাম বলেছিলেন, ১৮২৯ সালের আইন থেকে তৈরি এই বিধিনিষেধের কারণে একজন প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্বের সব অংশ পালন করতে না পারা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি এটিকে ‘পুরোনো’ ও ‘সেকেলে’ বিধান হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ২০ জুলাই ২০২৬ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী, ফার্স্ট লর্ড অব দ্য ট্রেজারি, সিভিল সার্ভিস মন্ত্রী এবং মিনিস্টার ফর দ্য ইউনিয়ন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নতুন বিলটি মূলত ব্রিটেনের দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের একটি নির্দিষ্ট অংশ পরিবর্তনের উদ্যোগ। এর লক্ষ্য হলো প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয় যাই হোক না কেন, তিনি যেন প্রধানমন্ত্রীর সব সাংবিধানিক দায়িত্ব সমানভাবে পালন করতে পারেন—এমন আইনি কাঠামো তৈরি করা।
সূত্রঃ রিলিজিয়ন মিডিয়া সেন্টার, দ্য হেরাল্ড স্কটল্যান্ড এবং দ্য ট্যাবলেট
এম.কে

